Sunday, July 19, 2026

পলায়নের ঘটনায় হাসিনার নামে নতুন মামলার প্রস্তুতি। (BDC CRIME NEWS24)

 BDC CRIME NEWS24

পলায়নের ঘটনায় হাসিনার নামে নতুন মামলার প্রস্তুতিঃ

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৮: ২৪আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৮: ২৫

পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নতুন মামলা হচ্ছে। এ মামলায় আসামি করা হবে তার সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া ছোট বোন শেখ রেহানাকেও। এতে তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন না করে দেশত্যাগের অভিযোগ আনা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত ২০১৩ সালের অভিবাসী আইনে মামলা দায়েরের সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার পলায়নকালীন ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এ মামলায় ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে পালাতে সহায়তাকারীদেরও যুক্ত করা হতে পারে। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা ৩টা ৯ মিনিটে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশ ছাড়ার জন্য ঢাকার বীরউত্তম একে খন্দকার বিমানঘাঁটি (তৎকালীন বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটি) থেকে বিমানে ওঠেন। বিমানে ওঠার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ও শেখ রেহানার সঙ্গে ব্রিটিশ পাসপোর্ট থাকলেও তারা ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন না করেই অবৈধভাবে দেশত্যাগ করেন বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।

শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার প্রচলিত আইন অমান্যের বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু বিমানবন্দর বা অনুমোদিত চেকপোস্ট দিয়ে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষ করেই বিদেশে যাওয়া যায়। ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ও নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোনো স্থান দিয়ে দেশত্যাগ করলে বিধান অনুযায়ী সেটা অবৈধ ও বেআইনি বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালত সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অনধিক পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে।

অবশ্য জুলাই গণহত্যায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এছাড়া দুর্নীতির মামলায় আদালত শেখ হাসিনা ও শেখ

রেহানাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে। বর্তমানে উভয়েই দণ্ডিত পলাতক আসামি। শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে ভারতের আশ্রয়ে থাকলেও রেহানার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই তদন্তকারী দলের কাছে। তবে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের নাগরিক শেখ রেহানা বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন। মাঝে মধ্যে তিনি ভারতে যাওয়া-আসা করেন।

নিজের সিদ্ধান্তেই বোনকে নিয়ে পালান হাসিনা

বাইরে বিভিন্ন আলোচনা থাকলেও ভারতে পলায়নের সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা নিজেই নেন বলে অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা গণভবনের (বর্তমানে জুলাই জাদুঘর) লেক রোডের গেট দিয়ে সড়কপথে গাড়িতে করে পুরাতন বাণিজ্যমেলার মাঠে আসেন। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে কুর্মিটোলায় বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটিতে আসেন। লাগেজপত্র নিয়ে তিনি বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের লকহিড সি-১৩০জে হারকিউলিস বিমানে (যার কল সাইন এজেএএক্স১৪৩১) চড়ে বসেন। পুরো প্রক্রিয়াটিই শেখ হাসিনার ইচ্ছা অনুযায়ী হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। দেশ ছেড়ে তিনি ভারতে আশ্রয়ের জন্য যাবেনÑএমন সিদ্ধান্তের কথা তিনি গণভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানান। শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনুযায়ীই তাকে ভারতে নেওয়ার বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পলায়নের জন্য গণভবন থেকে বের হওয়ার পর তিনি দেড় ঘণ্টার বেশি সময় পেলেও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি। এটি ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও জানান তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গণভবন থেকে ভারতের হিন্দন বিমানবন্দর পর্যন্ত শেখ হাসিনার সঙ্গে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এ মামলায় সাক্ষী হচ্ছেনÑএমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন তদন্তদলের এক সদস্য।

শেখ হাসিনার পলায়নের বিষয়ে তদন্তদল দুটি অডিও ক্লিপও আলামত হিসেবে নিয়েছে। একটি ৫ আগস্ট পলায়নের উদ্দেশে গণভবন থেকে বের হওয়ার পরপরই। শেখ রেহানাকে ওই সময় সালমান এফ রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা একটি নিরাপদ জায়গায় যাচ্ছি। আপনি এক সেকেন্ডও দেরি না করে বেরিয়ে যান।’ রেহানার ওই কথার প্রতিউত্তরে সালমান জানতে চেয়ে বলেন, ‘আচ্ছা, তোমরা অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছ? আপাও (শেখ হাসিনা) তোমার সঙ্গে গেছে?’ জবাবে রেহানা বলেন, ‘জি ভাই। আপনিও ইমিডিয়েটলি বের হয়ে যান। এখানে থাকা একদম সেফ না। এক মিনিটও দেরি কইরেন না।’ শেখ রেহানা ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দুই মিনিট ৯ সেকেন্ডের ওই কথোপকথনের অডিওর ফরেনসিক সম্পন্ন করেছে তদন্ত সংস্থাটি। ফরেনসিক প্রতিবেদনে তারা এটির সত্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে দেশে থাকতে পারবেন না বলে নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের কাছে। পলায়নের আগের দিন ৪ আগস্ট তার সঙ্গে টেলি কথোপকথনে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘তারা (আন্দোলনকারীরা) কারফিউ-টারফিউ কিছু মানছে না। আমি ঠিক করেছিলাম আজই রাষ্ট্রপতির কাছে যাব। সবকিছু লিখে ঠিক করে রেখেছি। এভাবে ক্ষমতায় থাকা আর সম্ভব না।’ শেখ হাসিনার ওই কথার জবাবে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘ইমার্জেন্সি জারি করে দেখেন না।’ জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন আর ইমার্জেন্সিতেও কাজ হবে না। তুমি আবার এটি বাইরে বলতে যেও না। এ দেশে আর থাকা সম্ভব না। এ দেশে আর না।’ শেখ হাসিনা ও হাছান মাহমুদের ওই কথপোকথনের ফরেনসিকও সম্পন্ন করেছে তদন্তদল। একটি প্রতিবেদনে অডিও ক্লিপটি হাসিনা ও হাছান মাহমুদের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

ভারতেরও দায় দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

শেখ হাসিনা ও রেহানা ইমিগ্রেশন প্রসেস ছাড়াই বাংলাদেশের সীমান্ত পার হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এতে তিনি দুদেশের আইন ভঙ্গ করেছেন বলে জানান ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আমার দেশকে বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ভোটাধিকার হরণের পাশাপাশি শেখ হাসিনা একজন গণহত্যাকারী। এটি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে দেশে টিকতে না পেরে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি প্রচলিত আইন অনুযায়ী ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করেননি বলেই জানতে পেরেছি। এটি আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আইনানুযায়ী তার বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সালেহ উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, জুলাই বিপ্লবের মুখে পড়ে শেখ হাসিনা জনরোষ থেকে বাঁচতে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম ছাড়াই ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। ছোট বোন রেহানাকেও একইভাবে সঙ্গে করে নিয়ে যান। তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের মামলা হবে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আইনের পাশাপাশি ভারতের ইমিগ্রেশন আইনও ভঙ্গ করেছেন। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনোভাবেই ভারত শেখ হাসিনাকে গ্রহণ করতে পারে না। তাকে আশ্রয় দিতে হলে আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী রিফিউজি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। ভারত তাকে কোন স্ট্যাটাসে গ্রহণ করেছে, সেটা তারাই বলতে পারবে। যদিও দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জয়স্ওয়াল সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ভারতে আইনগত প্রসেসের মধ্যে রয়েছেন। তিনি (হাসিনা) নিজের ইচ্ছায় ভারত ত্যাগ করতে পারবেন না।’

পালিয়ে যাওয়ার পরপরই শেখ হাসিনা ও রেহানার বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত প্রচলিত আইনে মামলা হওয়া জরুরি ছিল বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের অপর আইনজীবী জয়নাল আবেদীন মেজবাহ। আমার দেশকে তিনি বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে দেরিতে হলেও সরকার এখন মামলার উদ্যোগ নিয়েছে, এটি আশার কথা।

শেখ হাসিনার অপরাধের বর্ণনা দিয়ে অ্যাডভোকেট মেজবাহ বলেন, শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের ঘটনা বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার ও প্রকাশ করেছে। তার গণহত্যার বর্ণনাও জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্তারিত এসেছে। এমন একজন গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী জনরোষ থেকে বাঁচতে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। নিজে পালানোর আগে আত্মীয়স্বজনদের নিরাপদে দেশ থেকে বের করে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, তার দলের ও আত্মীয়দের মধ্যে আরো যারা ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন না করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের বিষয়ে তদন্ত ও অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

হাসিনার পলায়ন ও পদত্যাগের ঘোষণা

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে শেখ হাসিনা দেশ থেকে পলায়নের পর ওইদিন বিকালেই দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তব্য দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। এতে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করব।

ওইদিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ‘আপনারা জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি।’

পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করার কথা জানানো হয়। এতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বসম্মত মতামতও নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। দুদিন পর ৮ আগস্ট শপথ নেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার।

সেনাপ্রধানের মুখ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের ঘোষণা প্রচারের আগেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার পলায়নের সংবাদ প্রকাশ হয়।

শেখ হাসিনা পালানোর এক মাস পর জানা যায়, অবস্থান ও যাত্রাপথ গোপন রাখার স্বার্থে তাকে বহনকারী ফ্লাইট এজেএক্স১৪৩১ উড়োজাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজটি প্রথমে কলকাতার দিকে যায়। কারণ এটি দ্রুত বাংলাদেশের আকাশসীমা ছাড়তে চেয়েছিল। ঢাকা-দিল্লির যে আকাশপথ রয়েছে, সেটি দিয়ে গেলে উড়োজাহাজটিকে রাজশাহীর ওপর দিয়ে যেতে হতো। এতে বাংলাদেশের আকাশসীমায় উড়োজাহাজটিকে আরো কয়েক মিনিট থাকতে হতো।

ভারত সীমান্তে পৌঁছানোর পর সেটি দিল্লি থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটির দিকে যায়। ভারতীয় গণমাধ্যমের মতে, উড়োজাহাজটি ঢাকার সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। এরপর হাসিনাকে উত্তর প্রদেশের নয়ডায় একটি নিরাপদ বাড়িতে নেওয়া হয়।

হাসিনাকে নামিয়ে দেওয়ার পর বিমানটি রিফুয়েলিং করে এবং ফ্লাইট ক্রু ও সিকিউরিটি সার্ভিসেস ফোর্স (এসএসএফ) সদস্যদের নিয়ে একই দিন ঢাকায় ফিরে আসে। জানা গেছে, হাসিনা-রেহানার পাশাপাশি ক্রু ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ওই বিমানের কেউই ঢাকা ছাড়ার আগে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করেননি।

তদন্তকারী দলের এক সদস্য জানিয়েছেন, ছাত্র-জনতা যখন গণভবনে প্রবেশ করে, তখন শেখ হাসিনা উড়োজাহাজে। ওই সময়ই এটির ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ট্রান্সপন্ডারের মাধ্যমে উড়োজাহাজের অবস্থান, গন্তব্য, উচ্চতা, গতি ও স্বয়ংক্রিয় জিওলোকেটরের তথ্য পাওয়া যায়। উড়োজাহাজটি যখন পশ্চিমবঙ্গের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন এটির ট্রান্সপন্ডার পুনরায় চালু করা হয়।

অপরদিকে উড়োজাহাজটির জিওলোকেটর চালু করা হয় ঢাকা-কলকাতা রুটের ‘বিইএমএকে’ ওয়ে পয়েন্টে পৌঁছানোর পর। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ উড়োজাহাজটির কোড নম্বর দেয় ১৪৩১। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে প্রতিটি উড়োজাহাজকে চার সংখ্যার এমন আলাদা একটি কোড দেওয়া হয়। কোডটি হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজের ট্রান্সপন্ডারে ম্যানুয়ালি যুক্ত করা হয়। হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজের যাত্রাপথ ও বাংলাদেশের ভেতরে এটির অবস্থান গোপন রাখতেই বন্ধ রাখা হয় ট্রান্সপন্ডার।

হাসিনা-রেহানাকে বহনকারী উড়োজাহাজটিকে ২৪ হাজার ফুট উচ্চতায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। উড্ডয়নের পর শাহজালাল বিমানবন্দরের ট্রাফিক কন্ট্রোলার হাসিনাকে বহনকারী উড়োজাহাজের পাইলটকে একটি সতর্কতাবার্তাও পাঠান। এতে বলা হয়, একটি উড়োজাহাজ ঢাকার দিকে আসছে এবং এটি তাদের ঠিক উপরে আছে।

শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পরদিন ৬ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সে দেশের পার্লামেন্টে একটি বিবৃতি দেন। এতে তিনি শেখ হাসিনাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের জানামতে নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতে আছেন।’ পরে সংসদীয় কমিটির এক সভায় জয়শঙ্কর বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা জানতাম হাসিনার সরকার টিকবে না। তবে কিছু করার ছিল না। পরিস্থিতি আমাদের হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল।’

জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশের কথা উল্লেখ করে ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। এসব চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এদিকে শেখ হাসিনাকে ফেরত এনে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরের বিষয়ে আশাবাদী বর্তমান সরকারও। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে দেওয়া পৃথক বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান শেখ হাসিনাকে দেশে এনে রায় কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, স্বৈরাচার হাসিনা একটি দেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। ওখান থেকে বড় বড় কথা বলছেন। আমরা তার প্রত্যাবর্তন চেয়েছি আইনানুগভাবে। এক্সট্রাডিশন চুক্তি অনুসারে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময় পত্র দেওয়া হয়েছে, আমরা তাগাদাপত্র দিয়েছি। আমরা চাই তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হবে।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, শেখ হাসিনা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে সরকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে ধারাবাহিকভাবে তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সূত্রঃ আমার দেশ

 

Tuesday, July 14, 2026

ডিআইজি আনিসের ‘জঙ্গি নাটক’ ৯ বছর পর নির্দোষ চার পরিবার। (BDC CRIME NEWS24)

BDC CRIME NEWS24 

ডিআইজি আনিসের ‘জঙ্গি নাটক’ ৯ বছর পর নির্দোষ চার পরিবার:

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮: ৩৭

যশোরে চার পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘জঙ্গি’ নাটক মামলা দীর্ঘ ৯ বছর পর শেষ হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের পর সম্প্রতি আদালত তাদের নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দিয়েছে। এ মামলায় ভুক্তভোগী তানজির আহমেদ, মো. মহিউদ্দিন, মেহেদী হাসান পাশা ও সাদ্দাম ইয়াসির সজলের জীবন ও ক্যারিয়ার তছনছ হয়ে গেছে।

তাদের অভিযোগ, এ মামলার নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছেন যশোরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ও পরবর্তী সময়ে রাজশাহীর ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, তার নির্দেশে তরুণদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলার পাশাপাশি আবু সাঈদ নামে বিএনপির এক কর্মীকে কথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত এ হত্যার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট যশোরে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আবু সাঈদের স্ত্রী পারভীন খাতুন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান আহমেদ অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের খুলনা রেঞ্জ ডিআইজিকে (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল) নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি যশোরের ধর্মতলা এলাকায় ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিতর্কিত কর্মকর্তা আনিসের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ‘পলায়নের’ অভিযোগে তাকে গত বছরের ৩০ জুলাই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

আনিস ২০১৪ সালের ২৪ মার্চ যশোরের পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত তিনি সে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

পলাতক থাকায় অভিযোগের বিষয়ে আনিসের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। যশোরে কর্মরত অভিযুক্ত ডিবি ও থানাপুলিশের সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের সন্ধানও মেলেনি।

তানজিরের পরিবারের ওপর নির্যাতন

তানজিরের পরিবারের নারী-শিশুসহ কোনো সদস্যই বাদ যায়নি পুলিশের সাজানো মামলার হয়রানি থেকে। ভুক্তভোগী তানজির জানান, ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তাদের বাড়িতে হানা দেয় ডিবি পুলিশ। তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। পুলিশ তার বড়ভাইকে তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক দেয়। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সদস্যদের তালিকা তৈরি করে পুলিশ তার দুই বোন এবং তাদের স্বামীদেরও সাজানো মামলায় আসামি করে।

তিনি আরো জানান, ২০১৬ সালের রমজানের এক রাতে পুলিশ আবারও তাদের বাড়িতে হানা দেয়। পুলিশ তাকে এবং তার মেজো বোনকে তিন বছরের বাচ্চাসহ ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। দীর্ঘ হয়রানি ও বন্দিদশায় জেলখানায় বসেই এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন তানজির। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পেলেও পুলিশের নিয়মিত নজরদারি ও ভয়ভীতি তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।

পুলিশের মামলার অভিযোগে বলা হয়, তারা অভয়নগরের একটি মাদরাসায় গোপন মিটিং করছিলেন। মামলায় তানজির, তার ভাই, দুই বোন ও দুলাভাইসহ পরিবারের সাত সদস্যকে আসামি করা হয়। জেল থেকে জামিনে বের হওয়ার পরও পুলিশ জেলগেট থেকে পুনরায় তানজিরকে ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। একই সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়, জামিন পাওয়ার পর তানজির পলাতক। পরবর্তী সময়ে ঢাকা থেকে তার বড়ভাই ও মেজো বোনকে ধরে নিয়ে প্রায় ৪৫ দিন আটকে রাখা হয়। শেষে পুলিশ তাদের দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে ‘স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ’-এর নাটক সাজায়। তারা দীর্ঘ হয়রানির শিকার হন। তানজির, তার ভাই, দুই বোন ও এক দুলাভাইকে কারাভোগ করতে হয়। দীর্ঘ ৯ বছরের এ অমানবিক ভোগান্তির অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট। হাসিনার পতনের পর আইনি লড়াই শেষে তানজিরের পরিবারের সদস্যরা সব মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

মহিউদ্দিনের পরিবারের বিভীষিকাময় দিন

চাঁচড়া পশ্চিমপাড়ার মো. মহিউদ্দিন এবং তার পরিবারও এ ‘জঙ্গি’ নাটকের শিকার। ২০১৬ সালে মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে জঙ্গি মামলা দিয়ে তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিসের নির্দেশে তার স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মহিউদ্দিনের অভিযোগ, তার নববধূকে তুলে নিয়ে ডিভোর্স দিতে চাপ দেয় ডিবি পুলিশ। এমনকি মহিউদ্দিনের বাবাকেও গ্রেপ্তার করে একই জঙ্গি মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মহিউদ্দিনের বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ও স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন। ৩৬ বছর বয়সি মহিউদ্দিন সরকারি চাকরির সুযোগ হারিয়ে বর্তমানে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। আদালতের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণে এ পরিবারটিও মামলা থেকে বেকসুর খালাস পায়।

পাশাকে ক্রসফায়ারের হুমকি

২০১৫ সালে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান পাশাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ১১ দিন ডিবি হেফাজতে চোখ বেঁধে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। পাশার অভিযোগ, পুলিশের চরম হুমকিতে তাকেসহ অন্যদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়।

তার ভাষায় ১৫-২০ জন পুলিশ তাকে ঘিরে ধরে ব্যাপক মারধর ও নির্যাতন করত। এক রাতে অভিযানের কথা বলে তাকে পুরো শহর ঘুরিয়ে ‘ক্রসফায়ারে’ মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।

তিনি জানান, জামিন পেলেও দীর্ঘ ৯ বছর তাকে পুলিশের কড়া নজরদারিতে থাকতে হয়। যশোরের বাইরে যাওয়া ছিল নিষিদ্ধ। নিয়মিত পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে অপরিচিত ব্যক্তিরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করত। ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর তাকে সব মামলা থেকে খালাস দেয় আদালত।

আরেক ভুক্তভোগী সজলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ তার স্ত্রী ও ছয় বছর বয়সি সন্তানকে তুলে নেয়। পুলিশের দুর্ব্যবহারে সে শিশু আজও ট্রমার শিকার। সজলের স্ত্রী তখন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

মামলাগুলোর আইনি দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ৯ বছর ধরে কেন চলল? এমন প্রশ্নের জবাবে ভুক্তভোগী পাশার আইনজীবী মো. মাহমুদ কবীর কাকন বলেন, ‘তখনকার সরকারের চাপে পড়ে বিচারকের কিছুই করার ছিল না।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে প্রধানমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। এরপর থেকেই আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি ডিআইজি আনিসকে। গোপালগঞ্জের সন্তান আনিসের স্ত্রী ফাতেমা তুজ্জহুরা শ্যামলী ছিলেন সংরক্ষিত আসনের এমপি।

সূত্র: আমার দেশ 

Tuesday, July 7, 2026

জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাসে অমর ১০ নারী-শিশু। (BDC CRIME NEWS24)

BDC CRIME NEWS24 

জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাসে অমর ১০ নারী-শিশু

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮: ৫৬

জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস লিখতে গেলে শুধু রাজপথের ছাত্র-জনতার কথা বললে চলবে না, সমান গুরুত্ব দিতে হবে নারীদেরও। ওই বিপ্লবে তারা কখনো ছিলেন মিছিলের অগ্রভাগে, কখনো আহতদের সেবায় আবার কখনো তথ্যপ্রবাহের নীরব যোদ্ধা।

অনেকেই নিজ ফ্ল্যাটের বারান্দা কিংবা ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকারীদের সাহস ও উৎসাহ জুগিয়েছেন। আন্দোলন দমনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী পুলিশের ছোড়া গুলি তাদেরও রেহাই দেয়নি।

সরকারি গেজেট অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের মধ্যে ১০ নারী-শিশু রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন শিক্ষার্থী, দুজন কর্মজীবী, দুজন গৃহবধূ এবং একজন গৃহকর্মী। এসব হত্যাকাণ্ড কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অমূল্য দলিল। ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে গুলির সামনে দাঁড়িয়ে লেখা এক অবিনশ্বর ইতিহাস।

জুলাই বিপ্লবের শহীদ হয় কিশোরী নাঈমা সুলতানা। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায় সে। রাজধানীর উত্তরায় বাসার বারান্দায় শুকাতে দেওয়া কাপড় আনতে গিয়ে ১৯ জুলাই মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় সে। মাথার এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। বারান্দাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রক্ত। প্রতিবেশীরা হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিভে যায় একটি সম্ভাবনাময় জীবন।

অথচ পাঁচদিন পরই ছিল তার জন্মদিন। পরিবারের সবাই জন্মদিন উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু জন্মদিনের কেকের বদলে ঘরে আসে কফিন।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈমার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। মা আইনুন নাহারের ভাষায়, ‘এই মাসেই আমি মেয়েকে পেয়েছিলাম, আবার এই মাসেই হারালাম। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তার শেষ উচ্চারণ ছিল মা।’

জুলাই বিপ্লবের আরেক ট্র্যাজেডি রিয়া গোপ। তার পৃথিবী ছিল খেলনা, স্কুল আর পরিবারের ছোট্ট পরিসর। মাত্র সাড়ে ছয় বছর বয়সি শিশুটি বুঝতেই পারেনি রাজপথের সংঘাত কতটা নির্মম হতে পারে। ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে বাসার ছাদে খেলছিল সে। গোলাগুলির শব্দে বাবা তাকে কোলে নিয়ে নিচে নামতে উদ্যত হন। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি গুলি এসে লাগে রিয়ার মাথায়। বাবার কোলেই ঢলে পড়ে সে।

তাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ছুটে বেড়িয়েছেন বাবা-মা। মাথায় অস্ত্রোপচারও হয়। কিন্তু বাঁচানো যায়নি তাকে। কয়েক দিন পর না ফেরার দেশে চলে যায় ছোট্ট রিয়া। জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সি শহীদ সে।

‘আব্বু, হাসিনা পলাইছে’

১৭ বছরের নাফিসা হোসেন মারওয়া ছিল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই বন্ধুদের নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিল। বাবা ছিলেন চা-দোকানি। মেয়ের আন্দোলনে যাওয়া নিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকতেন।

৫ আগস্ট দুপুরে বাবাকে ফোন করে নাফিসা বলেছিল, ‘আব্বু, হাসিনা পলাইছে।’ উত্তরে বাবা শুধু বলেছিলেন, ‘তাড়াতাড়ি বাসায় যা।’ কিন্তু তার আর ফেরা হয়নি। সাভারে লংমার্চে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে আহত হয় সে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়। পরিবারের স্বপ্ন ছিল মেয়েটি উচ্চশিক্ষা শেষ করবে। সে স্বপ্ন থেমে যায় রাজপথেই।

আড়াই মাসের শিশু রেখে চিরবিদায়

মাত্র ২০ বছরের সুমাইয়া আক্তারের কোলজুড়ে ছিল আড়াই মাসের শিশু। ২০ জুলাই বিকালে বাসার পাশে চলা সংঘর্ষের শব্দ শুনে বারান্দায় গিয়ে পরিস্থিতি দেখতে চেয়েছিলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গ্রিল ভেদ করে আসা একটি গুলি তার মাথায় আঘাত হানে। রক্তে ভেসে যায় বারান্দা। হাসপাতালে নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় কোনো যানবাহন পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার সন্তান এখন বড় হচ্ছে নানির কাছে। মায়ের মুখটি সে কোনোদিন মনে রাখতে পারবে না।

সংসারের হাল ধরা মায়ের শেষ পথচলা

পাঁচ সন্তান আর পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামীকে নিয়ে চলছিল সংগ্রামী শাহিনূর বেগমের সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এই নারী মাছের ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। জুলাই বিপ্লবের সময় ২২ জুলাই ফজরের নামাজ শেষে প্রতিদিনের মতো হাঁটতে বের হয়েছিলেন কাজলা সেতুর দিকে। রাজপথে তখনও থমথমে পরিস্থিতি। হঠাৎই গুলির শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। প্রায় এক ঘণ্টা রাস্তায় পড়েছিলেন। কেউ এগিয়ে আসতে সাহস পাননি। শেষ পর্যন্ত অচেনা এক ব্যক্তি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে ওই ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে শাহিনূরের মেয়ে বলেন, ‘আল্লাহ যেন ফেরেশতা পাঠিয়েছিলেন। না হলে আমার মা হয়তো রাস্তায়ই মারা যেতেন।’

ঢাকা মেডিকেলে দীর্ঘ এক মাস ৯ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য বহু মানুষের কাছে ধরনা দিয়েছেন। সবার চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে।

তার মৃত্যুর পর শুধু একটি প্রাণই নিভে যায়নি; ভেঙে পড়ে একটি পরিবার। সন্তানদের পড়াশোনা থেমে গেছে, পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্বামী অসহায় হয়ে পড়েছেন।

গৃহকর্মীর রক্তেও লেখা জুলাইয়ের ইতিহাস

জুলাই বিপ্লবের শহীদদের তালিকায় সবচেয়ে নীরব অথচ হৃদয়বিদারক গল্পগুলোর একটি মোসা. লিজা আক্তারের। ভোলার দরিদ্র পরিবার থেকে ঢাকায় এসেছিলেন জীবিকার সন্ধানে। রাজধানীর শান্তিনগরের একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। পাশাপাশি একটি মহিলা মাদরাসায় আরবি পড়তেন। জীবন বদলানোর ছোট্ট স্বপ্ন ছিল তার। ১৮ জুলাই বিকালে বাইরে গোলাগুলির শব্দ শুনে অন্যদের মতো তিনিও বারান্দায় দাঁড়ান। মুহূর্তেই একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় মাথায়। হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও তাকে বাঁচানো যায়নি। ২২ জুলাই তিনি মারা যান।

লিজার পরিচয় কোনো আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে নয়; বরং একজন সাধারণ গৃহকর্মী হিসেবে। সে কারণেই তার মৃত্যু যেন আরো নির্মম বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়Ñসেদিন গুলি মানুষের পরিচয় দেখে আঘাত করেনি।

বেড়াতে এসে লাশ

নোয়াখালীর মেয়ে নাছিমা আক্তার ঢাকায় এসেছিলেন বড় ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে। পরিবারের কারো কল্পনায়ও ছিল না, কয়েক দিনের সফরই হয়ে উঠবে জীবনের শেষ সফর। ১৯ জুলাই বিকালে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় সংঘর্ষ কিছুটা কমেছে মনে করে তার দুই ভাতিজা ছাদে ওঠে। তাদের পেছন পেছন যান নাছিমাও। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছুটে আসে গুলি। গুলিতে আহত হন নাছিমা ও তার ভাতিজা। গুলি নাছিমার গলা ভেদ করে খাদ্যনালিতে আঘাত করেছিল। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও একদিন পর তার মৃত্যু হয়।

পরিবারে সবার ছোট হওয়ায় ছিলেন সবার আদরের। গ্রামের বাড়িতে তার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। সে ঢল ছিল শুধু এক তরুণীর জন্য নয়; একটি অসমাপ্ত জীবনের জন্য।

থেমে যায় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন

রিতা আক্তারের বাবা ছিলেন রিকশাচালক। মা বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করেও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করেননি তারা। কারণ রিতা ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ডাক্তার হয়ে বাবা-মায়ের কষ্ট দূর করবেÑএমন স্বপ্ন নিয়েই মাধ্যমিক শেষে ঢাকায় পড়তে আসে সে। মিরপুরের একটি সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়।

৫ আগস্ট বাবা রিকশা নিয়ে বেরিয়ে যান, মা যান কর্মস্থলে। সে সুযোগে রিতা যোগ দেয় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে। সন্ধ্যা পর্যন্ত মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে মা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে থাকেন। অবশেষে গভীর রাতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে গিয়ে জামাকাপড় দেখে শনাক্ত করেন মেয়ের নিথর দেহ। তার মাথার এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। পরে তার লাশ গ্রামে নিয়ে দাফন করা হয়। সেই সঙ্গে মাটিচাপা পড়ে যায় দরিদ্র বাবা-মায়ের বহু বছরের স্বপ্নও।

নাতিকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিলেন দাদি

১৯ জুলাই দুপুর। বাসার সামনে তখন ছাত্র-জনতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ চলছে। সাত বছরের নাতি মুসা আইসক্রিম খেতে চাইলে তাকে নিয়ে নিচে নামেন মায়া ইসলাম (৬০)।

এরপর দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে গিয়েই ঘটে বিপর্যয়। একটি গুলি প্রথমে নাতির মাথা ভেদ করে এসে ঢোকে মায়ার তলপেটে। রক্তাক্ত অবস্থায় কয়েক ধাপ উঠতেই সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরিবার প্রথমে বুঝতেই পারেনি তিনিও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সবার মনোযোগ ছিল ছোট্ট মুসাকে ঘিরে। পরে হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, একই গুলি নাতি ও দাদি-দুজনকেই বিদ্ধ করেছে। কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর শেষ পর্যন্ত হার মানেন মায়া। নাতির জন্য দাদির এই জীবন উৎসর্গের গল্প জুলাইয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের নির্মমতার হৃদয়বিদারক প্রতীক হয়ে থাকবে।

আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না

পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরি করতেন মেহেরুন নেছা তানহা (২২)। বাবার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে চাইতেন না, নিজের খরচ নিজেই চালাতেন। তার আন্দোলনে নামার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত বেদনা। মামাতো ভাই রাব্বি ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন। ভাইয়ের লাশ ঘিরে পরিবারের অসহায়ত্ব তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপর আর ঘরে থাকতে পারেননি তিনি। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিদিন রাজপথে দাঁড়াতেন। প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকত ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।’

৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর মানুষ যখন আনন্দ মিছিল করছিল, তানহাও বাইরে ছিলেন। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ছোট ভাইকে ফোন করে সতর্ক করেনÑনিরাপদ পথে ফিরতে। সেই ফোনকল শেষ হওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরই জানালার সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় একটি গুলি এসে তার শরীরে আঘাত হানে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিভে যায় তার প্রাণপ্রদীপ।

এই ১০ নারীর পরিবারের সদস্যরা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে তাদের পরিচয় শুধু শহীদ হিসেবে নয়, প্রত্যেকেই একেকটি সংগ্রামের প্রতীক হয়ে থাকবেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু তাদের শহীদের স্বীকৃতি দেওয়া নয়; তাদের আত্মত্যাগের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদের পরিচয় পৌঁছে দেওয়া। কারণ ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের গল্প নয়; ইতিহাস তাদেরও, যারা নিজেদের স্বপ্ন, ভালোবাসা, পরিবার এবং জীবন উৎসর্গ করে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদান রেখে যান।

তাদের রক্তের ঋণ শুধু স্মরণে নয়; ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকারে পরিশোধ করতে হবে। সেটিই হবে জুলাইয়ের বীরকন্যাদের প্রতি জাতির সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা।

সূত্র: আমার দেশ 

Monday, July 6, 2026

পলাতক ৩ জেনারেল এখন কলকাতার সেনা এলাকায়। (BDC CRIME NEWS24)

BDC CRIME NEWS24

পলাতক ৩ জেনারেল এখন কলকাতার সেনা এলাকায়ঃ

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮: ২৬

 


ভারতে পলাতক বাংলাদেশের তিন আলোচিত জেনারেল— লেফটেন্যান্ট জেনারেল (বরখাস্ত) মো. মুজিবুর রহমান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন এবং মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ এখন কলকাতার সেনা আবাসিক এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন।

পতিত স্বৈরাচার ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অন্যতম সহযোগী এবং ভারতের ডিপ স্টেট তথা গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই তিন জেনারেলকে মোদি সরকার সম্প্রতি বেসামরিক এলাকা থেকে কলকাতার সুরক্ষিত সেনা আবাসিক এলাকায় সরিয়ে নিয়েছে। ঢাকা ও কলকাতার একাধিক নিরাপত্তা সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য জানিয়েছে।

পলাতক তিন জেনারেলের মধ্যে মুজিব ও আকবর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পরপরই দেশ ছেড়ে পালিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন। এরপর গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের উদ্যোগের পর গত বছরের অক্টোবরে জেনারেল কবীর আহাম্মদও দেশ ছেড়ে পালিয়ে কলকাতায় চলে যান।

বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, আয়নাঘরে নির্যাতন, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখতে বিরোধী দল দমনসহ নানা ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত পলাতক এই তিন জেনারেল কলকাতার অভিজাত এলাকা সল্টলেক ও নিউ টাউনের সঞ্জিবা গার্ডেন কমপ্লেক্সে পরিবারসহ বসবাস করছিলেন। সম্প্রতি তাদের এই বেসামরিক এলাকা থেকে সরিয়ে হুগলি ব্রিজের পাশে অবস্থিত সুরক্ষিত সেনা আবাসিক এলাকায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই তিন জেনারেলের গতিবিধি সম্পর্কে অবগত কলকাতার নিরাপত্তা সূত্রগুলো আমার দেশকে জানিয়েছে, তিন জেনারেলকে সেনা আবাসিক এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা খুবই ইঙ্গিতবহ।

কলকাতার সেনা আবাসিক এলাকাটি অত্যন্ত সুরক্ষিত। বিশেষ পাস ছাড়া সাধারণ মানুষের এখানে প্রবেশ এক প্রকার নিষিদ্ধ। পলাতক এই তিন জেনারেল নিয়মিতই যোগাযোগ রাখেন শেখ হাসিনার সঙ্গে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করেন তারা। ভারতীয় ডিপ স্টেটের সঙ্গে মিলে কীভাবে আবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা যায় তা নিয়েই তৎপর এই তিন জেনারেল।

নিরাপত্তা সূত্রগুলো আরো জানিয়েছে, এই তিন জেনারেল নিয়মিতই বিশেষ করে ছুটির দিনে কলকাতা সিটি সেন্টার-২-এ অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন। সম্প্রতি কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে দেখা গেছে এই তিন জেনারেলকে।

তিন জেনারেলের তৎপরতা এবং তাদের সুরক্ষিত সেনা আবাসিক এলাকায় আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাকে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নানা অপরাধে জড়িত এই তিন জেনারেলকে ভারত সুরক্ষিত সেনা আবাসিক এলাকায় আশ্রয় দিয়েছে তাদের স্বার্থে এবং বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যবহারের জন্য।

বিশ্লেষকরা আরো বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব অপরাধী জেনারেলের বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা। একই সঙ্গে অপরাধীদের ভারত যে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক বিশ্বকে জানানো।

উল্লেখ্য, জুলাই বিপ্লবের পর ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ তার যেসব সহযোগী ভারতে পালিয়ে গেছে, তাদের পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেস তৈরি করেছে ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো। সেই ডেটাবেসে জেনারেল মুজিব, জেনারেল আকবর এবং জেনারেল কবীরের সঙ্গে থাকা পরিবারের অন্য সদস্যদের যাবতীয় তথ্যও সংরক্ষণ করা হয়েছে। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, তিন জেনারেল কলকাতায় বসবাস করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিপ্লবের পরও সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন জেনারেল মুজিব। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তাকে বরখাস্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সূত্রগুলো আমার দেশকে জানায়, জেনারেল মুজিব বরখাস্ত হওয়ার পর ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি শেখ হাসিনার খুবই বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। আর্মড ফোর্সেস এবং পুলিশে ‘র’-এর অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

জেনারেল মুজিব বাংলাদেশে ‘র’-এর কো-অর্ডিনেটর হিসেবে চিহ্নিত। বিমান বাহিনীতে ‘র’-এর শ্যাডো রিক্রুটার হিসেবে কাজ করা স্কোয়াড্রন লিডার আবদুল্লাহ ইবনে আলতাফ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সামগ্রিক তদন্তে বেরিয়ে আসে সামরিক বাহিনীতে ‘র’-এর নেটওয়ার্ক ও জেনারেল মুজিবের সম্পর্ক। আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে টানা ক্ষমতায় রাখতে গিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেন জেনারেল মুজিব ও তার নেটওয়ার্কের সদস্যরা।

জুলাই বিপ্লব চলাকালে সেনাবাহিনীতে ভারতপন্থি ক্যু করানোর জন্যও জেনারেল মুজিব আপ্রাণ চেষ্টা করেন। প্রথমে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট এবং পরে হাসিনার পলায়নের পরদিন ৬ আগস্ট তিনি ক্যু করানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় শেখ হাসিনার ভারতে পলায়নের ‘রেসকিউ মিশন’ সফল করার ক্ষেত্রেও জেনারেল মুজিবের বিশেষ ভূমিকা ছিল।

হাসিনা সরকারের পতনের পর জরুরি অবস্থা বা সামরিক আইন ঘোষণা করার জন্য তিনি কুখ্যাত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল তাবরেজ শামস, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক, মেজর জেনারেল হামিদুল হক, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরান হামিদের সঙ্গে একাধিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন। কুখ্যাত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের সঙ্গে মিলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও আয়নাঘরে নির্মম নির্যাতনের মতো সব অপরাধের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি (মাস্টারমাইন্ড)।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ওপর যে বর্বরতম হামলা হয়, তারও পরিকল্পনাকারী ও অপারেশন পরিচালনার অন্যতম দায়িত্বে ছিলেন মুজিব। র‌্যাবের জিয়াউল আহসানের সৃষ্টি হয়েছে মুজিবের হাতে। যদিও জিয়াউলের নাম নৃশংসতার জন্য যতটা আলোচিত হয়েছে, চতুর মুজিবের নাম ততটা হয়নি।

দুর্নীতির অভিযোগে লে. জে. মুজিব ও তার স্ত্রী তাসরিন মুজিবের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাদের ৩৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এবং তাদের নামে থাকা ঢাকায় দুটি ফ্ল্যাট, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট, খিলক্ষেত ও পূর্বাচল এলাকায় থাকা ১০টি প্লট জব্দের আদেশ দিয়েছে।

ফ্যাসিস্ট হাসিনার আরেক একান্ত অনুগত এবং ভারতের ডিপ স্টেটের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ গুম, খুনের সঙ্গে জড়িত দুটি ভুয়া নির্বাচনের মূল কারিগর লে. জে. (অব.) মো. আকবর হোসেন জুলাই বিপ্লবের পর কোনো এক সময়ে ভারতে পালিয়ে যান। ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান এই তিন তারকা জেনারেল বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, আয়নাঘরে নির্যাতন, বিরোধী দল দমনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার মতো নানা অপরাধের অন্যতম হোতা।

জেনারেল মুজিবের মতো তিনিও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয় ডিপ স্টেট ‘র’-এর অনুপ্রবেশ ঘটানোর অন্যতম কারিগর। ২০১৪ সালের বিনা ভোটের এবং ২০১৮ সালের রাতের ভোটের মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই বিতর্কিত জেনারেল। ২০১৪ সালের একতরফা বিনা ভোটের নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী দল। এমনকি জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং তখন ঢাকায় এসে নির্বাচনে যেতে এরশাদের ওপর চাপ দেন। তবে এরশাদ তাতে রাজি হননি। পরবর্তী সময়ে দিল্লির নির্দেশে তৎকালীন ডিজিএফআই-প্রধান জেনারেল আকবর বাসা থেকে এরশাদকে জোর করে তুলে নিয়ে সিএমএইচে বন্দি করে রাখেন এবং জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করেন।

বহুল আলোচিত সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার অন্যতম হোতা ছিলেন এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। তিনি এখন কলকাতায় বসে হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য ভারতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর। ইতোমধ্যে জোরপূর্বক গুমের অভিযোগে সাবেক এই জেনারেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

গুম ও নির্যাতনের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পতিত স্বৈরাচার হাসিনার সাবেক সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ গত বছরের অক্টোবরে ভারতে পালিয়ে যান। জেনারেল কবীরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে সেনা সদরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জেনারেল কবীরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

একজন সার্ভিং বা কর্মরত জেনারেল কীভাবে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতের মতো বৈরী প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আশ্রয় নিলেন তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন এবং উদ্বেগ তৈরি হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে গুমের দায়ে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে, তা আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন জেনারেল কবীর। তিনি তখন কলকাতা যাওয়া-আসার মধ্যে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর গত ৯ অক্টোবর জেনারেল কবীর বিশেষ ব্যবস্থায় তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ আমলের গুমের ঘটনায় দুটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ৮ অক্টোবর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৮ জনকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করে। তাদের মধ্যে ২৫ জনই সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা। এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন জেনারেল কবীর।

গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জেনারেল কবীর প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকসের কমান্ড্যান্টের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। সবশেষ গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর তার চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়।

গত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় খুনি মে. জে. জিয়াউল আহসান এবং কদমবুচি জেনারেল হিসেবে পরিচিত মে. জে. মাহবুব রশিদের কোর্সমেট হওয়ার সুবাদে ডিজিএফআইয়ের সিটি আইবিতে পোস্টিং দেওয়া হয় জেনারেল কবীরকে। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিবের পদ লাভ করেন তিনি। জেনারেল জিয়া, মাহবুব ও কবীর একসঙ্গে গুম-নির্যাতনের পাশাপাশি নানা দুর্নীতি ও অপরাধে জড়ান। নেত্রকোনার বাসিন্দা জেনারেল কবীর জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টের জিওসিকে মোবাইলে ফোন করে ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর জন্য শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে নির্দেশ দেন।

এদিকে তিন জেনারেলের পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং সেখানে ভারতের পক্ষ থেকে তাদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। এ প্রসঙ্গে তিনি আমার দেশকে বলেন, ঘটনাটি খুবই উদ্বেগের। বাংলাদেশের জেনারেলরা ভারতকে তাদের জন্য নিরাপদ মনে করেছেন।

তিনি বলেন, ভারত তাদের আরাম-আয়েশ করার জন্য আশ্রয় দেয়নি। নিজেদের স্বার্থে ভারত এই জেনারেলদের বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্যবহার করতে পারে। এসব জেনারেল নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রফেসর এম শহীদুজ্জামান এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেন, এই তিন জেনারেল নিশ্চিতভাবেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। তারা ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। পলাতক এসব জেনারেল বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনেক স্পর্শকাতর তথ্য জানেন।

তিনি বলেন, আমাদের জেনারেলরা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছেন এবং ভারত তাদের আশ্রয় দিচ্ছে, এটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি। ভারত আসলে উসকানি দিচ্ছে। ভারত চাইছে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে। ভারতে যেসব জেনারেল আশ্রয় নিচ্ছেন তারা যে ভারতের হয়ে এখানে নানা ধরনের অপরাধ করেছেন তা এখন প্রমাণিত। ভারত এই অপরাধী জেনারেলদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে।

অপরাধী জেনারেলদের ভারত যে আশ্রয় দিচ্ছে, সে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশি বেশি তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকেই নজর রাখছে। সরকারের দায়িত্ব হলো বিষয়টি ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা এবং এসব অপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে দ্রুত শেষ করা। এটা করতে পারলে ভারত আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়বে।

সূত্রঃ আমার দেশ

Tuesday, June 16, 2026

বেনজীর গ্রেপ্তারে পলাতক আ.লীগে আতঙ্ক বিরাজ করছে। (BDC CRIME NEWS24)

BDC CRIME NEWS24 

বেনজীর গ্রেপ্তারে পলাতক আ.লীগে আতঙ্ক বিরাজ করছে:

প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৬, ০৮: ৩৫

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্নীতির মামলায় বিদেশের মাটিতে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের এই হাই-প্রোফাইল কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের খবর ছড়াতেই বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে থাকা বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতৃবৃন্দের মাঝে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।

বিশেষ করে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও হত্যা মামলার আসামি এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিসের প্রক্রিয়ায় থাকা নেতারা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তারা বর্তমান আশ্রয়স্থল ছেড়ে আরো নিরাপদ কোনো দেশে আশ্রয়ের সন্ধান করছেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারিকৃত পলাতক আসামি বেনজীর আহমেদকে দুবাই সিটি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে আবুধাবি সরকার ১২ জুন শুক্রবার বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট শাখাকে নিশ্চিত করে। গত রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতিতে এটা জানিয়েছেন। সরকারের তরফ থেকে সব ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন সাপেক্ষে তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

জানা গেছে, বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। মানিলন্ডারিংসহ বেনজীরের বিরুদ্ধে দুদকের ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার বিচার চলছে। বাকি পাঁচ মামলার তদন্ত চলমান। এছাড়া তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম, খুন ও গণহত্যার অন্তত ১০টি মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তিনটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে বলে গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্টে থাকা একাধিক ব্যক্তি বিদেশে গ্রেপ্তার ও পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনা ইতোপূর্বে ঘটলেও বেনজীরের মতো হাই-প্রোফাইল কোনো ব্যক্তির গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি। বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনাকে মাইলফলক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ সরকার। এ বিষয়ে রোববার সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য, এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

এদিকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী শিবিরে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত সাড়ে ১৫ বছরের খুন-হত্যা-নির্যাতনে অভিযুক্ত দলটির নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তারসহ বিচারের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে চব্বিশের ৫ আগস্টের আগে পরে বৈধ-অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি দিয়ে নিজেদের ‘আপাতত নিরাপদ’ ভাবতে শুরু করলেও বেনজীরের ঘটনা তাদের ঘুম হারাম করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থান করা নেতাকর্মীরা উৎকণ্ঠায় পড়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন দেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে নাকচ হওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে দলের নেতাদের মধ্যে নতুন করে ভয় তৈরি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, দলের যেসব নেতার নামে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ও সাজা হয়েছে তাদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী, দুর্নীতিবাজ ও গুম-খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আমলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পলাতক সদস্যদের মাঝেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা বর্তমানের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে ভারতে অবস্থানরত নেতৃবৃন্দ এখনো নিজেদের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে করছেন। শেখ হাসিনাসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের ভারত সরকার যেভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে তাতে তারা মনে করছেন, যে কোনো পরিস্থিতিতে মোদি সরকার তাদের পাশেই দাঁড়াবে। এদিকে ভারতকে ‘অপেক্ষাকৃত নিরাপদ’ মনে করা হলেও বিভিন্ন সময়ে দেশটিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেখানে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত মে মাসের শেষদিকে সেখানে আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। অবশ্য, ভারতে গ্রেপ্তার হলেও তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা নেই বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনাকে বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের জন্য বড় বার্তা মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনা কেবল আওয়ামী লীগই নয়, যারা অপরাধ করে বিদেশে পালিয়ে আছেন তাদের সবার জন্যই একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর পরই গ্রেপ্তার এড়াতে দলটির অসংখ্য নেতাকর্মী সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তাদের অনেকেই সুযোগ বুঝে ভারত ছেড়ে অন্যান্য দেশে গিয়ে অবস্থান করছেন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক আমার দেশকে বলেন, পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতার একটি নজির স্থাপন করেছে। বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের যেসব নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা অন্যান্য গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের জন্য এটি উদ্বেগজনক সংকেত। অনেক দেশ এখন অভিবাসন ও ভিসা প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার ও দুর্নীতির তথ্য যাচাই করছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পরোয়ানা বা রেড নোটিস ইস্যু করা সম্ভব হলে গ্রেপ্তার এড়ানো কঠিন হতে পারে।

বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ আমার দেশকে বলেন, বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবরটি নিঃসন্দেহে ভালো খবর। এই গ্রেপ্তারে একটি শুভ লক্ষণ হচ্ছেÑআবুধাবি সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশকে খবরটি জানিয়েছে। তবে, এই গ্রেপ্তারের মানেই তিনি ফিরে আসছেন সেটা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। এর জন্য একটি লম্বা প্রক্রিয়া রয়েছে। বেনজীর যে অপরাধী তার সব তথ্য-প্রমাণ নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিদেশে গ্রেপ্তারের পরে আবার মুক্তিও পেয়ে যায়। খুব করে আশা করব বেনজীরের ক্ষেত্রে সেটা হবে না। সরকারের উচিত হবে দ্রুত তথ্য-প্রমাণ দিয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে তাকে ফিরিয়ে আনা।

বেনজীরের গ্রেপ্তারের পথ ধরে গণহত্যা, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িতদের ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির মাধ্যমে ফেরত আনার পথ উন্মুক্ত হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই বিশ্লেষক বলেন, বেনজীরের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি অবশ্যই ইতিবাচক। এটা অন্যদের ক্ষেত্রেও হয়তো প্রভাব পড়বে। তবে আমরা যতটা ভাবছি বিষয়টি ততটা সহজ নয়। কারণ এগুলো নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মর্জির ওপর। অপরাধীর অপরাধের বিষয়ে দেশগুলোকে সন্তুষ্ট করে কূটনৈতিক দেন-দরবার করতে হয়।

এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার চাইলেও তো ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে আনতে পারছে না। কারণ ভারত সরকার তাকে অতিথি করে রেখেছে। কেবল ভারত সরকার চাইলেই শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা সম্ভব। অন্য অপরাধীদের হিসাব-নিকাশও একই ধরনের হবে।

বেনজীরকে ফেরাতে নথিপত্র তৈরিতে তোড়জোড়

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া এক সময়ের প্রতাপশালী বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে একাধিক সংস্থা নথিপত্র প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও দুদকের পক্ষ থেকে এসব নথি প্রস্তুত করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে, আবার কিছুটা সংশয়ও রয়েছে। কারণ এর আগে ব্যাংক কেলেঙ্কারির হোতা পি কে হালদার, সন্ত্রাসী জিসান আহমেদকে আরব আমিরাত থেকে ফেরানো যায়নি। আবার সাত খুন মামলার আসামি নুর হোসেন, রাজন হত্যা মামলার আসামি কামরুল, নরসিংদীর সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ খান হত্যা মামলার আসামি আরিফ সরকার এবং মতিঝিলের টিপু-প্রীতি হত্যা মামলার আসামি সুমন শিকদার ওরফে মুসাকে বিদেশ থেকে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। এখন বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর জোর দিতে হবে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, মূলত মানিলন্ডারিং মামলায় বেনজীরকে দুবাইয়ে আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুদকে ছয়টি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। তাকে ফেরাতে দুর্নীতির সব নথিপত্র গোছাচ্ছে দুদক।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুবাই থেকে বেনজীরকে ফেরত আনতে আমরা নথিপত্র তৈরি করছি। দুদক জানায়, ঢাকার গুলশানের ১২৬ নম্বর রোডের একটি ভবনের দুটি ফ্লোরে চারটি ফ্ল্যাটের মালিক ছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। গত বছরের ডিসেম্বরে এই ফ্ল্যাটগুলো ক্রোক করে আসবাবপত্রসহ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয় দুদক।

তবে গোপালগঞ্জের সাভানা রিসোর্টটি স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। দুদক জানায়, ৭৪ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চারটি মামলাসহ পাসপোর্ট জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিং মিলিয়ে বেনজীরের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা রয়েছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ অঢেল সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী মো. মাহমুদুল আরেফিন স্বপন সাংবাদিকদের জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দণ্ডিত বন্দিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বেনজীর তো দণ্ডিত নন, এখন প্রশ্ন, তাহলে কী হবে? এটা আলাপ-আলোচনার বিষয়। এই চুক্তি কার্যকর তখনই হতো যদি বেনজীর আহমেদ দণ্ডিত হতেন। তিনি আরো জানান, যেহেতু বেনজীর ইন্টারপোলের সহযোগিতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, এখন ইন্টারপোলের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারকে বসতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, ইন্টারপোলকে বিস্তারিত বিষয় জানানোর জন্য আমরা চিঠি প্রস্তুত করছি। বেনজীরকে শিগগিরই দেশে ফিরিয়ে আনব।

সূত্র: আমার দেশের 

Monday, May 25, 2026

সেনা কর্মকর্তাদের বিচার কোন পথে। (BDC CRIME NEWS24)

BDC CRIME NEWS24 

সেনা কর্মকর্তাদের বিচার কোন পথে:

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬, ০৮: ৫০

ভারতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম-খুন-অপহরণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিচার প্রক্রিয়া এখন চলমান। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অভিযুক্ত সেনাকর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এতে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে বিচার বানচালসহ নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিচারকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগীদের অনেকেই হয়রানির আতঙ্কে রয়েছেন।

সেনা অফিসারদের বিচার কোন প্রক্রিয়ায় হবে এ নিয়ে নানা বিতর্কের পর ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী মামলায় সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচার শুরু হওয়াকে ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু বিচারের শুরু থেকেই সামরিক অফিসারদের মাঝে বিভক্তি ছড়ানো, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও শেষাবধি তাদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণার অভিযোগ আসছে। এ প্রোপাগান্ডায় ভারতপন্থি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে নানা অপতথ্য।

বিচারের সূচনা ও অগ্রগতি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক ও বর্তমান সেনাকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী লীগের সময় সংগঠিত বিভিন্ন গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, অপহরণ ও বেআইনিভাবে র‍্যাবের টিএফআই ও জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা জেআইসিতে আটক করে ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগসহ পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। নানা জল্পনা-কল্পনার পর গত বছরের ২২ অক্টোবর আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল-১ এ ১৫ সেনা কর্মকর্তাকে হাজির করা হয়।

এদিন অভিযুক্ত সেনা অফিসারদের বিশেষায়িত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে করে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। তার আগে ৮ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। সেদিন দুটি গুমসহ তিনটি মামলায় দাখিলকৃত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। গুম সংক্রান্ত টিএফআই ও জেআইসি’র দুটি মামলা হচ্ছে বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম-নির্যাতনের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায়। অন্যটি হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায়।

গুমের মামলাগুলোর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী আমার দেশকে জানান, ডিজিএফআই সংক্রান্ত মামলাটিতে এ পর্যন্ত বিএনপি নেতা ও গুমের শিকার হুম্মাম কাদের চৌধুরী, লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান, গুমের শিকার দুজন ব্যবসায়ীসহ পাঁচজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। টিএফআই সংক্রান্ত মামলাটিতে এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন আট বছর ধরে গুমের শিকার ও বর্তমান সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান, মাসরুর আনোয়ার, সফিকুল ইসলামসহ চারজন। মামলাগুলোতে আরো কয়েক ডজন গুমের শিকার ও সংশ্লিষ্টের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

অপপ্রচার ও ইন্ডিয়া ফ্যাক্টর

ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, আসামিপক্ষ নানাভাবে মামলা কার্যক্রমে ধীরগতি ও জটিলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে শুরু থেকেই। বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানাভাবে ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় নানা ডকুমেন্টস চাওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সামরিক অফিসারদের বিচার নিয়ে চিহ্নিত ভারতপন্থি মিডিয়া ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ভিত্তিহীন ও মনগড়া খবর প্রচার করার অভিযোগ আসছে। যাতে বলা হচ্ছে, এসব সামরিক অফিসার পুরোপুরি নির্দোষ ও ঘটনার শিকার। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে এ সংক্রান্ত মামলায় সাক্ষীদের সম্পর্কেও নানা ধরনের অপতথ্য ছড়িয়ে তাদের বিতর্কিত করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ ও দোসররা অর্থায়ন করছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে প্রকাশিত ইংরেজি মিডিয়া নর্থ-ইস্ট নিউজ তাদের বেশ কয়েকটি রিপোর্টে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সামরিক অফিসারদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে শতাধিক গুম-খুনে জড়িত সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বোন ও তারই আইনজীবী নাজনীন নাহারকে হাইলাইটস করা হয়। এ বছর ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত নিউজে গুমের মামলাগুলোর অন্যতম সাক্ষী লে. কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমানকে ভারতীয় স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী উলফার অস্ত্রের প্রশিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই নিউজ সাইটটি পরদিন ১৫ এপ্রিল শতাধিক গুম খুনে অভিযুক্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে নির্দোষ প্রমাণে তাকে ‘ঘটনার শিকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই প্রোপাগান্ডা গ্রুপের আরেক অংশ হিসেবে ইউটিউবার কাজী রুনা তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেলে সামরিক অফিসারদের বিচারে সাজানো সাক্ষী হাজির করা, জেরায় তাদের তথ্যের গরমিলসহ নানা বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা করে কৌশলে সামরিক অফিসারদের নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। এভাবে বিভিন্ন ধরনের সাইট ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত গুম-খুনের এসব মামলাকে দুর্বল করার চেষ্টা করার অভিযোগ উঠছে।

ষড়যন্ত্র ও চ্যালেঞ্জ

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) কেন্দ্রে গুম ও নির্যাতনের শিকার হুম্মাম কাদের চৌধুরী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গত ১৯ জানুয়ারি সাক্ষ্য দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এ তার জবানবন্দিতে তিনি নিজের গুম হওয়ার ঘটনা, আটক অবস্থায় দীর্ঘদিনের নির্যাতন এবং জেআইসি সেলে কাটানো অভিজ্ঞতার বিস্তারিত তুলে ধরেন। জবানবন্দিতে তিনি জেআইসির এ মামলায় অভিযুক্ত আসামি সামরিক কর্মকর্তাদের দ্রুত বিচার দাবি করেন।

ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা জেআইসিতে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী ও গুমের শিকার সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান আমার দেশকে বলেন, আসামিপক্ষ ক্রমাগত বিচার বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে। তবে সবচেয়ে যেটি আমি আশঙ্কা করছি সেটি হলো, এসব গুম-খুনের নেপথ্যের নায়করা যেন বিচারের আওতা থেকে বেরিয়ে না যায়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সত্যকে স্বীকার করা, যাতে বাংলাদেশে আর গুম সংস্কৃতি ফিরে না আসতে পারে।

আমার দেশ-এর সঙ্গে কথা হয় ২০১৯ সালের ১৯ জুন গাজীপুর এলাকা থেকে গুমের শিকার ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরিন জাহান স্মৃতির। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিগত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পটপরিবর্তনের পর তিনি তার স্বামীর গুমের অভিযোগ করেন। র‌্যাব হেড কোয়াটারে কর্মরত সিগনার অফিসার রাসেল আহমেদ কবির, কায়সার এ হাবিবসহ ৯ জনকে অভিযুক্ত করে এ অভিযোগ করেন। নাসরিন জাহান স্মৃতি জানান, এত মাস হয়ে গেল কিন্তু অভিযুক্ত র‌্যাব সদস্যদের কিছুই হয়নি। আমরা কোনো বিচার পাব বলে মনে হচ্ছে না। আমরা হতাশ। এটি যদি র‌্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ না হতো তাহলে হয়তো মামলা এগুতো। এখন উল্টো আমরা ভয়ে রয়েছি। কারণ র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে আমরাই আবার গুমের শিকার হয়ে যাই কি না, সেই আতঙ্কে রয়েছি।

গুম সংক্রান্ত গঠিত বিএনপির গঠিত কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম জাহিদ বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময় সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের গুমের ঘটনাগুলোর অভিযোগের একটি তালিকা আমরা দিয়েছিলাম। এর আসামিদের তালিকায় ছিল র‌্যাব, আয়নাঘরে গুমে থাকা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু এগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়ায় এখনো পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা সন্তুষ্ট নয়।

২০১৬ সালের ২৫ জুন খুলনা শহরের পাওয়ার হাউজ এলাকা হতে র‌্যাব পরিচয়ে উঠিয়ে নেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান সিফাতকে। তার ভাই মাহফুজ আমার দেশকে বলেন, আমার মেধাবী নিরপরাধ ভাইকে ১৭ দিন গুম রেখে বিভিন্ন কথিত জঙ্গি মামলায় ৪৩ দিন রিমান্ড রেখে নির্দয়ভাবে মেরে ফেলা হয়। ট্রাইব্যুনালসহ বিভিন্ন সংস্থায় আমরা অভিযোগ দায়ের করলেও রাষ্ট্র র‌্যাব সদস্যসহ অভিযুক্তদের কিছুই করেনি। আমরা পুরোপুরি হতাশ। আমাদের আশঙ্কা সেনা অফিসার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা জড়িত থাকায় এ বিচারটি এগোয়নি।

র‍্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এভাবেই ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃত অফিসাররা ছিলেন হুকুমের গোলাম, তারা নির্দোষÑ এভাবে মূল অভিযুক্তদের দোষ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে। আমাদের বুঝতে হবে এসব অভিযুক্ত এবং নেপথ্যের কুশীলবদের কাছে প্রচুর লুটপাটের অবৈধ অর্থ রয়েছে। তাই তারা বিভিন্নভাবে এ বিচারের ফোকাস থেকে জাতিকে অন্যদিকে নেওয়ার চেষ্টায় আছে।

অভিযুক্ত সামরিক অফিসারদের বিচার নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না বলে আমার দেশকে জানান বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা চিরাচরিতভাবে তাদের মক্কেলের মামলা দেরি করতে চেষ্টা করতেই পারে। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে পুরোপুরি সচেতন। মামলাগুলোতে অনেক আসামি হওয়ায় তাদের জেরায় প্রচুর সময় যাচ্ছে। মামলাগুলোর অগ্রগতিতে কোনো ধরনের বাধা বা চাপ রয়েছে কি নাÑ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বা অন্য কোথাও থেকে এ বিষয়ে কোনো বাধা নেই। তিনি এ সংক্রান্ত মামলাগুলোর অগ্রগতিতে আরো কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে সম্পর্কে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

উল্লেখ্য, টিএফআই সংক্রান্ত মামলায় মোট আসামি ১৭ জন, তাদের মধ্যে ১০ জন অফিসার কাস্টডিতে রয়েছেন। আর ডিজিএফএর মামলায় মোট ১৩ জন আসামির তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ মামলাগুলোর প্রধান আসামির তালিকায় আরো রয়েছেন পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকী প্রমুখ।

সূত্র: আমার দেশ

Sunday, May 17, 2026

বিভক্ত হেফাজতে ইসলাম, ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা। (BDC CRIME NEWS24)

BDC CRIME NEWS24 

বিভক্ত হেফাজতে ইসলাম, ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা:

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ০৮: ৫৯

নানা ইস্যুতে কার্যত দ্বিধাবিভক্ত দেশের আলোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। কওমি মাদরাসাভিত্তিক এই অরাজনৈতিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই নিষ্ক্রিয়। পতিত আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার এ আলেম সমাজের নেতারা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশেও ঐক্যবদ্ধ ও পুরোনো ঐতিহ্যে ফিরতে পারেনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব ও জটিলতা এখনো কাটেনি। পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্নভাবে সংগঠনটির বিভাজন কাটানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার সফলতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন রয়েছে। অবশ্য সব বিভাজন কাটিয়ে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে হেফাজত আগের মতোই ঐক্যবদ্ধ হবে বলে দাবি করছেন একাধিক নেতা। সংগঠনে বিভাজন কাটিয়ে শৃংখলা ফেরাতে নানাভাবে কাজ শুরু হয়েছে বলেও তারা জানান।

এদিকে সম্প্রতি হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের নামে অপবাদ ও অপপ্রচার চালিয়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে সংগঠনটির ভোলা জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে মাওলানা রাকিবুল ইসলাম ফারুকীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি মাদরাসায় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়। তাছাড়া সেখানে বিভাজন কাটাতে গঠিত সাব-কমিটি ১১ দলীয় ঐক্য সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।

সূত্র মতে, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে দেশে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার লক্ষ্যে কওমি মাদরাসা শিক্ষকদের নিয়ে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক ও কওমি মাদরাসা বোর্ড-বেফাকের চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে সংগঠনটি। শুরুতেই সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয় এটি।

ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় নেওয়া ইসলামবিরোধী নানা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বেশ আলোচিত হয়ে ওঠে। তৎকালীন সরকারের পরোক্ষ সমর্থনে শাহবাগে নাস্তিক ব্লগারদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবিতে শাপলা চত্বরের সমাবেশটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কর্মসূচিটি সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দল ও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে গণজোয়ার তৈরি করেছিল। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের সমাবেশে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর আওয়ামী আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর নির্মম হামলায় চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে হেফাজতে ইসলাম। ওই ঘটনায় বহু নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। সে সময় শাহ আহমদ শফীকে নাজেহাল, জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। গৃহবন্দি করে রাখা হয় মুফতি ফজলুল হক আমিনীকে।

একই সঙ্গে হেফাজত সংশ্লিষ্ট শীর্ষ নেতাকর্মীদের নামে মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ডসহ নানাভাবে দমন-পীড়ন চালায় ফ্যাসিবাদী সরকার। সংগঠনটিকেও নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলে। তবে শাপলা হত্যাকাণ্ডের বীভৎসতায় সারা দেশে হেফাজত নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তাদের কবজায় রাখতে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে হেফাজত থেকে প্রার্থী দেওয়া এবং মন্ত্রী-এমপি বানানোর প্রলোভন দেখানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাতে সাড়া না দিয়ে বরং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী বিরোধী শক্ত অবস্থানে ছিলেন হেফাজত নেতাকর্মীরা।

একইভাবে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও প্রকাশ্য কোনো দলের পক্ষে অবস্থান নেয়নি সংগঠনটি। যদিও ২০১৮ সালের নভেম্বরে ‘আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’ আয়োজিত শোকরানা সমাবেশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি এবং তাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দিয়ে বেশ সমালোচিত হন হেফাজত নেতারা। সমাবেশে শাহ আহমদ শফীর উপস্থিতি নিয়ে সংগঠনটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। জুনায়েদ বাবুনগরীসহ অনেকে এতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। পরবর্তী সময়ে এই অসন্তোষ হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়। অবশ্য কওমি সনদের স্বীকৃতি আদায়ের স্বার্থেই আল্লামা শফী তাতে যোগ দেন বলে তখন সংশ্লিষ্টরা ব্যাখ্যা দেন।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আল্লামা শফীর মৃত্যু-পরবর্তী হেফাজতে একের পর এক অস্থিরতা ও দমন-পীড়ন নেমে আসে। তার মৃত্যুর পর নভেম্বরে সম্মেলনের মাধ্যমে মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে (হাটহাজারী) আমির এবং ঢাকার বারিধারা মাদরাসার প্রিন্সিপাল নূর হোসাইন কাসেমীকে হেফাজতের মহাসচিব করা হয়। এতে আহমদ শফীর অনুসারীরা স্থান পাননি। পরের মাস ডিসেম্বরে নূর হোসাইন কাসেমী মারা গেলে নায়েবে আমির খিলগাঁও মাদরাসার প্রিন্সিপাল নূরুল ইসলাম জিহাদী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন।

তবে নতুন কমিটি গঠনের ছয় মাস পার হওয়ার আগেই নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার ঘটনার পর পুলিশি দমন-পীড়নের মুখে পড়েন নেতাকর্মীরা। এক পর্যায়ে ২০২০ সালের ২৫ এপ্রিল হেফাজতের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন জুনাইদ বাবুনগরী। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে জুনাইদ বাবুনগরী ও নুরুল ইসলাম জিহাদীকে রেখে পাঁচ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন হয়।

অন্যদিকে মোদিবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হেফাজতের শীর্ষ অর্ধ শতাধিক নেতা গ্রেপ্তার হন। এ অবস্থায় নানামুখী চাপে কারারুদ্ধ ও আলোচিত রাজনৈতিক নেতাদের বাদ দিয়ে ৭ জুন জুনাইদ বাবুনগরী ও নূরুল ইসলাম জিহাদীর নেতৃত্ব ৩৩ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। তারা কারারুদ্ধ নেতাদের মুক্তিসহ হেফাজতকে সংগঠিত করার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি।

এদিকে ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট মারা যান জুনাইদ বাবুনগরী। হাটহাজারীতে তার জানাজার আগেই নতুন আমির নির্বাচিত হন মামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। এরপর ২৯ ডিসেম্বর মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদীও মৃত্যুবরণ করলে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন আল্লামা সাজিদুর রহমান। পরের বছর ৫ জানুয়ারি পূর্ণ মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি।

সূত্র মতে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী হেফাজতের কমিটিতেও রদবদল করা হয়। এতে ফিরে আসেন ফ্যাসিবাদী আমলে বিলুপ্ত কমিটির নেতারা। তবে চব্বিশের বিতর্কিত নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দলের নেতাদের হেফাজত থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে দুঃখপ্রকাশ করে ফেরার সুযোগ পান কয়েকজন।

এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে বেশ সোচ্চার হয় হেফাজত। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে শীর্ষ নেতাদের বহু ধারায় বিভক্তিতে সংগঠনটিতে ফের স্থবিরতা ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রচারের বিষয়ে হেফাজতের আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান ছিল না। তবে ওই নির্বাচনে সংগঠনটির আমির ও মহাসচিবসহ অনেকে জামায়াত জোটকে ভোট দেওয়া হারাম ঘোষণা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বেশ তৎপর ছিলেন। অবশ্য তাদের বক্তব্য ব্যক্তিগত বলে হেফাজতের পক্ষ থেকে জানানো হয়। সংগঠনটির অরাজনৈতিক আরেক অংশ নির্বাচনি মাঠে অনেকটা নীরব ছিলেন।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নে হেফাজতে ইসলাম ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দুই অংশের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে প্রার্থী হন। তাদের মধ্যে হেফাজতের ঢাকা মহানগর সভাপতি ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল-হাবীব ও যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী অন্যতম। তাদের অনুসারীরা সরাসরি বিএনপি জোটের পক্ষে তৎপর ছিলেন। যদিও তাদের কেউ বিজয়ী হতে পারেননি।

আর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি সংশ্লিষ্ট হেফাজতের নেতারা নির্বাচনে অংশ নেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে। এদের মধ্যে হেফাজতের নায়েবে আমির ও খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, হেফাজতের ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক অন্যতম। তাদের অনুসারীরা সবাই জামায়াত জোটের পক্ষেই অবস্থান নেন। নির্বাচনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে দুজন এবং খেলাফত মজলিস থেকে একজন এমপি নির্বাচিত হন।

বর্তমানে জমিয়ত সংশ্লিষ্ট ও হেফাজতের জামায়াত জোটবিরোধীরা সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আর অন্যরা বিরোধী দলের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরব আছেন। এ অবস্থায় আঞ্চলিক পর্যায়ে ও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কর্মসূচি পালন হলেও হেফাজতের কেন্দ্রীয় ব্যানারে দীর্ঘদিন কোনো অনুষ্ঠান দেখা যাচ্ছে না। এমনকি ৫ মে শাপলার হত্যাকাণ্ড নিয়েও কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি পালিত হয়নি। ঢাকায় মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’ আয়োজিত কর্মসূচিতেও হেফাজত আমির বা মহাসচিবকে দেখা যায়নি।

হেফাজতের বর্তমান অবস্থান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, দীর্ঘদিন হেফাজতের কোনো মিটিং হয়নি। আমরা আমাদের দল নিয়ে আছি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের বাবুনগরে হেফাজত আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে মহাসচিবসহ বেশকিছু নেতার সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অনানুষ্ঠানিক ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে।

পরে হেফাজতের দপ্তর সম্পাদক আফসার মাহমুদ নিজের ফেসবুক পোস্টে বিস্তারিত তুলে ধরেন। পোস্টে তিনি জানান, ওই সফরের উদ্দেশ্য ছিল– আমিরে হেফাজতের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, পরামর্শ গ্রহণ, হুজুরের দোয়া নেওয়া এবং পটিয়ার মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের নদভীর কবর জিয়ারত।

এতে উপস্থিত থাকা অন্তত ১৫ শীর্ষ নেতার নাম উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, সৌজন্য সাক্ষাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। একপর্যায়ে এ কথা উঠে আসে, নানা কারণে হেফাজতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হেফাজতের কিছু নেতা বিভিন্ন দলে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সংগঠনের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে—এ সমস্যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। একপর্যায়ে হেফাজত আমির নিজস্ব সাংগঠনিক অধিকার বলে পর্যালোচনার আলোকে কিছু সিদ্ধান্ত দেন।

সে অনুযায়ী ১১ দলীয় জোটে অংশগ্রহণকারী নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু সমাধান এবং বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কয়েকজনকে দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, যেহেতু এটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছিল না, তাই কোনো প্রেস রিলিজ বা ছবিও ছিল না। কিন্তু তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কোনোভাবে প্রচারিত হয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় কিছু অপপ্রচার।

ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এতে উপস্থিত থাকা হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী গতকাল শনিবার বলেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক যে বিভাজন হয়েছিল, তার সুন্দর সমাধানের জন্য সাব-কমিটি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেই কমিটি কাজ শুরু করেছে। পরিস্থিতি ভালোর দিকেই যাচ্ছে বলে মনে করি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা হেফাজতকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করছি, আমরা বিভক্ত হইনি।

নির্বাচনি অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে এতদিন কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং হয়নি জানিয়ে ইসলামাবাদী আরো বলেন, বর্তমানে অনেকে হজে যাচ্ছেন। কওমি মাদরাসাগুলোও এখন কোরবানি নিয়ে ব্যস্ত। তাই হজের পর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। যে কোনো ইস্যু তৈরি হলে তা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা হবে।

হেফাজতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রসঙ্গে ইসলামাবাদী বলেন, এটা একদম ঠিক নয়। হেফাজত ছিল, আছে এবং থাকবে ইনশাল্লাহ।

হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ বলেন, হেফাজতের অনেক নেতা রাজনৈতিক ভাইরাল নেতা হওয়ায় অনেকে মনে করেন, হেফাজত বিভক্ত হয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন হেফাজত রাজনৈতিক দল হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের যে মূল ভিত্তিতে হেফাজত গঠিত, সেই স্বকীয়তা যাতে অটুট থাকে, সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছিলাম। আমরা একমত হয়েছি যে, রাজনৈতিক ঐক্য হতে পারে, তবে হেফাজতের ধর্মীয় ঐক্য যেন থাকে। অন্য রাজনীতির প্রভাব যাতে হেফাজতে না পড়ে।

হেফাজতের বর্তমান অচলাবস্থা ও বিভক্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংগঠনটির নায়েবে আমির আল্লামা মুহিউদ্দীন রাব্বানী বলেন, হেফাজত আমিরের উপস্থিতিতে সম্প্রতি হাটহাজারীতে বৈঠকে ইতিবাচক কিছু সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও ১১ দলীয় জোট সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কয়েকটি কমিটি হয়েছে। এসব কমিটি কাউকে বাদ দেওয়ার জন্য হয়নি। নির্বাচনের আগে এক ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হলেও এখন সবাই যাতে ভুল বোঝাবুঝি বাদ দিয়ে মিলেমিশে আগের মতো কাজ করতে পারি, সেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, হেফাজতের বিভাজন কাটাতে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সাব-কমিটির বৈঠক ইতিবাচক হয়েছে। যে যে দলই করি না কেন, হেফাজতের ১৩ দফা ইস্যুতে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব। বর্তমানে বিভিন্ন শাখার উদ্যোগে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হলেও শিগগিরই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি আসতে পারে বলেও আভাস দেন তিনি। পবিত্র হজের পর কার্যক্রম জোরদারের প্রত্যাশার কথা জানান তিনি।

হেফাজতের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে মুহিউদ্দিন রব্বানী বলেন, বিভিন্ন সময়ে প্রতিকূল পরিস্থিতি ছিল, এটা থাকবেই। আশা করি, ১৩ দফার ভিত্তিতে সবাই মিলেমিশে থাকতে পারব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরের শীর্ষ দুই নেতার দুই মেরুতে অবস্থান থাকলেও ১৩ দফার ইস্যুতে আমরা সবাই এক হয়ে যাব, ইনশাল্লাহ।

এদিকে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার জন্য গঠিত সাব-কমিটির প্রধান এ নেতা বলেন, পবিত্র হজের পর এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সূ্ত্রমতে, হেফাজতের সামনে উল্লেখযোগ্য দাবির মধ্যে রয়েছে নেতাকমীদের নামে বহাল আওয়ামী আমলের ৮০টিরও বেশি মামলা দ্রুত প্রত্যাহার করা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কওমি আলেমদের নিয়োগ, শাপলা চত্বরের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার দ্রুত রায় ঘোষণা করা এবং সমকামিতা ইস্যুসহ আগের ১৩ দফা।

সূত্র: আমার দেশ 

Tuesday, May 12, 2026

ধরাছোঁয়ার বাইরে হাসিনার ফ্যাসিবাদী বিচারকরা। (BDC CRIME NEWS24)

BDC CRIME NEWS24 

ধরাছোঁয়ার বাইরে হাসিনার ফ্যাসিবাদী বিচারকরা:

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ০৮: ৩৬

দেড় দশক ধরে দেশে খুন, গুম, হামলা, মামলা, দমন, পীড়ন ও লুটপাটের মাধ্যমে নাগরিকদের মানবাধিকার ও ভোটের অধিকার হরণে পলাতক শেখ হাসিনার সরকারের অন্যতম সহযোগী বিচারকরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর জনপ্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহু কর্মকর্তা জবাবদিহিতার আওতায় এলেও দায়ী বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে পুলিশ প্রশাসনসহ বেসামরিক প্রশাসনে অসন্তোষ বিরাজ করছে। পাশাপাশি হাসিনার ফ্যাসিবাদের সহযোগী ও ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ হিসেবে চিহ্নিত বিচারপতি ও বিচারকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও জোরালো দাবি উঠেছে।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যেও বিচারকদের ‘অঘোষিত দায়মুক্তি’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয়তবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতারাসহ আইনজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত চার হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সে সময়ে গুমের শিকার হন ৭০০ জন। বিভিন্ন মামলায় ৬০ লাখের বেশি লোক গায়েবি মামলার আসামি হন। কথা বলার স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশ করার স্বাধীন ও মৌলিক অধিকারগুলো হরণের মাধ্যমে বিরোধী মত দমনের নিকৃষ্টতম ইতিহাস রচিত হয়েছিল শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে। এসব অবিচারের পেছনের মূল কারিগর আদালতের বিচারকরা ছিলেন বলে দাবি আইনজীবী নেতাদের। তারা জানান, রাতের বেলায় লোডশেডিংয়ের মধ্যেও মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রহসনের বিচারে সাজা দিয়ে নিরপরাধ হাজারো রাজনৈতিক নেতাকর্মীর জীবন বিপন্ন করেন বিচারকরাই।

আইনজীবীদের দাবি, বর্তমানে অধস্তন আদালতগুলোতে নিযুক্ত দুই হাজার ১৮৫ বিচারকের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে নিয়োগ পেয়েছেন এক হাজার ৯৪১ জন। তাদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই সময় তারা বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের শাস্তি দিয়েছেন। এখন আবার তারাই গণহত্যার দায়ে কারাবন্দি অপরাধীদের জামিন দিতে ব্যাকুল হয়ে আছেন।

বিচার বিভাগের কঠোর সমালোচনা করেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা। তারা জানান, উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে দেশের জেলা ও মহানগর আদালতের বিচারকদের অনেকেই প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। কেউ কেউ নিজেদের ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ বলেও গর্ব করেন। বিভিন্ন সময়ে গড়ে ওঠা হাসিনাবিরোধী আন্দোলন দমাতে আদালতই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন আসামিকে আটকের পর আইন মেনেই পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দ করে। অথচ আদালত তাদের বছরের পর বছর কারাবন্দি করে রেখেছে। শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় বিচার বিভাগের বলেও দাবি তাদের।

বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিচারকদের হাতে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশেনের এক কর্মকর্তা জানান, সে সময় বিচারকরা বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দফায় দফায় রিমান্ড মঞ্জুর, জামিন না দেওয়া ও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি দিয়ে নির্মম নির্যাতনের পথে ঠেলে দিয়েছেন। বিচারিক জুরিসডিকশনের বাইরে গিয়ে গভীর রাতে, লোডশেডিংয়ের সময়ও এজলাসে মোমবাতি জ্বালিয়ে সাক্ষী হাজির করার জন্য পুলিশকে বাধ্য করেন বিচারকরা।

পুলিশ ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের দুঃসময়ে আমাদের বিচার বিভাগ ন্যায়বিচারের ধারা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। হয় দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন, নয়তো নতজানু অবস্থান নিয়েছিলেন। অভিযুক্ত বিচারকদের শাস্তি হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামানও। তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থেই হাসিনার ফ্যাসিজমের পৃষ্ঠপোষক বিচারকদের শাস্তি হওয়া জরুরি।’

আইনজীবীরা জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় আটক হওয়া আসামিকেও বেআইনিভাবে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন বিচারকরা। খাসকামরায় রিমান্ড ফেরত আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে অভিযোগ অস্বীকার করার পর বিচারকরা ‘পিটিয়ে হাড় ভেঙে’ নিয়ে আসার জন্য পুনরায় রিমান্ডে পাঠান। বিচারকদের বিরুদ্ধে এমন শত শত অভিযোগ রয়েছে বলেও জানান তারা।

খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পুরস্কৃত পাঁচ বিচারপতি

দেশের বিচার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত দুই মামলা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তবে অতি তুচ্ছ ঘটনাকে পুঁজি করে দায়ের হওয়া মামলা দুটি পাঁচ বিচারপতির জীবনের বাঁক পরিবর্তনে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে বলে অভিমত মামলাসংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। তাদের মতে, খালেদা জিয়াকে সাজা দিলে পুরস্কার পাবেন, এমন প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে তারা এ মামলার কার্যক্রমে অংশ নেন। মামলাগুলো জামিনযোগ্য হলেও বিচারপতিরা বারবার খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে বন্দি রাখার শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণে ভূমিকা রাখেন। তাদের অভিযোগ, এ দুটি মামলাই খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

আইন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বেআইনি নির্দেশ পালন করে অভাবনীয় পুরস্কারে ভূষিত হওয়া পাঁচজন হলেনÑবিচারপতি ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি মোহাম্মদ নুরুজ্জামান (ননী), বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদার, বিচারপতি কামরুল হোসেন মোল্লা ও বিচারপতি মো. আকতারুজ্জামান।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় মহানগর বিশেষ দায়রা জজ আদালত ১২ বছরের সাজা দেয়। হাইকোর্ট এ সাজার মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়িয়ে ১৭ বছর করে দেয়। পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে প্রহসনের নিকৃষ্টতর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন আমার দেশকে জানান, হাসিনার সরকার পছন্দের লোকদের বিচারকের আসনে বসিয়ে ও পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে এ ফরমায়েশি রায় আদায় করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে পাঁচ বিচারপতিই অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন করে খালেদা জিয়ার মামলাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করেছেন। বিচারের ইতিহাসে এমন কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করায় আলোচিত এ পাঁচ বিচারপতিকে শাস্তির আওতায় আনার দাবিও জানান খালেদা জিয়ার এ আইনজীবী।

তারেক-জুবাইদাকে সাজা দিতে টানা শুনানি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে দুদকের মামলায় টানা সাক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট সাজা দেন তৎকালীন মহানগর দায়রা জজ মো. আসাদুজ্জামান। রায়ে দুটি ধারায় তারেক রহমানের ৯ বছর কারাদণ্ড ও জুবাইদা রহমানের তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা ওই বিচারপতিকে হাইকোর্টের বিচারপতি করার প্রলোভন দেখিয়ে টানা সাক্ষ্য নিয়ে রায় আদায় করেন বলে দাবি করেন তারেক রহমানের আইনজীবী জয়নাল আবেদিন মেজবাহ।

অ্যাডভোকেট মেজবাহ বলেন, শুধু তারেক রহমান কিংবা জুবাইদা রহমানকেই নয়, বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মীকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলায় টানা শুনানি করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কখনো কখনো গভীর রাত পর্যন্ত সাক্ষী গ্রহণ করে বিচারকরা শাস্তি নিশ্চিত করে রায় লেখেন।

আইনজীবীরা জানান, ‘আমি-ডামি নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে আইন মন্ত্রণালয় থেকে তৎকালীন সিএমএম রেজাউল করীমের কাছে ১৫৮টি মামলার তালিকা দিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করতে বলা হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ৭৯টি মামলায় দ্রুত শুনানি শেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর এক হাজার ২৪৯ জন নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল আমার দেশকে বলেন, এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য শেখ হাসিনার নির্দেশে এ মিথ্যা মামলায় তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। যে বিচারকই এ মামলার নথিতে হাত দিয়েছেন, তিনিই সরকারের কাছ থেকে অবৈধ ও ‘আনডিউ’ সুবিধা পেয়েছেন। তিনি বলেন, শুনানিতে আমরা মামলার মেরিট তুলে ধরে আদালতে প্রকাশ্যেই এসব কথা বলেছি।

রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে রায় লেখা হয়

আইনজীবীরা জানান, রাজধানীর শান্তিনগরের বাসিন্দা বিএনপির একটি ওয়ার্ড সভাপতি ছিলেন ইকবাল হোসেন। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও প্রোস্টেটের রোগে আক্রান্ত ৭১ বছর বয়সি ইকবালের বিরুদ্ধে ৫২টি মামলা ছিল। দুটি মামলায় ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত এবং আরেকটি মামলার শুনানি বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শুনানি চলে। ওইদিন আদালত দুই ধাপে ১৬ সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ওই সময় এমন সাতটি বিচার কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত যে, এগুলোর কার্যক্রম রাতেও হয়েছে।

অ্যাডভোকেট সৈয়দ জয়নাল আবেদিন মেজবাহ বলেন, আমার দুই দশকের ওকালতি জীবনে এমন রায় ও বিচার কার্যক্রম কখনো দেখিনি, যেটা আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে দেখলাম।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে অনেক রাত পর্যন্ত মামলার শুনানি হয়েছে। একজন আইনজীবী হিসেবে আমাকেও আদালতে আসামিদের পক্ষে থাকতে হয়েছে। বিএনপি নেতাদের সাত শতাধিক মামলায় তিনি আইনজীবী ছিলেন বলে আমার দেশকে জানান।

আদালতের রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ১৮ অক্টোবরে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১৪-এর বিচারক। ওইদিন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৬ রাত ৮টা ও অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

রফিকুল আলম মজনুর আইনজীবী মহিউদ্দিন চৌধুরী জানান, পল্টন থানা পুলিশের দায়ের করা এক মামলায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১৪-এর বিচারক মঈনুল ইসলাম রাষ্ট্রপক্ষের ১১ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন দুপুর ১টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। ওইদিন বিকাল ৫টার পর অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর এসিএমএম বিচারক সুলতান সোহাগের আদালতে বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আদিলের আইনজীবী মামলার নতুন তারিখ চেয়ে আবেদন করলে তা খারিজ করে রাত ৮টা পর্যন্ত আরো পাঁচ সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান হাবিবসহ আরো কয়েকজনকে একটি মামলায় রাত ৮টা পর্যন্ত শুনানিতে চার বছর করে কারাদণ্ড দেয় আদালত।

জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ৪৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৪ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এক লাখ ৪১ হাজার ৬৩৬টি মামলা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে প্রতি বছর ১০ হাজার (প্রতিদিন ২৭টি মামলা হয়েছে)। শুধু ঢাকা বিভাগেই ওই সময়ের মধ্যে ছয় লাখ ১৬ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ১৫ হাজার ৭৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫০টি মামলার আসামি ছিলেন হাবিবুন নবী খান সোহেল। তিন শতাধিক মামলার আসামি ছিলেন অসংখ্য নেতা। তাদের অনেককে রাত ৮টা, কখনো কখনো রাত ৯টা পর্যন্ত আদালতের কাঠগড়ায় থাকতে হয়েছে।

আইনজীবীরা বলেন, রাতে হঠাৎ হঠাৎ লোডশেডিং বা অন্য কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে বিচারক তার সহকারীকে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিয়ে আসতে বলেছেন। কখনো কখনো মোমবাতির আলোতে লেখা হয়েছে শাস্তির আদেশ।

অধস্তন আদালতে আ.লীগ আমলের ১৯৪১ বিচারক

আইন মন্ত্রণালয় ও বিচারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানিয়েছে, দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে এখন বিচারকের সংখ্যা দুই হাজার ১৮৫ জন। এদের মধ্যে এক হাজার ৮৪১ জনই নিয়োগ পেয়েছেন বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে। এ সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মেধাবী শিক্ষার্থী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেলেও পরীক্ষায় দলীয় লোককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভাইভা বোর্ডে দলীয় লোককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি। মাদরাসা ছাত্র হওয়ার কারণে বাদ দেওয়া হয় অনেককে।

বাংলাদেশ সচিবালয় ও জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্যমতে, বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের আমলে ১৪টি নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এসব নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে মোট এক হাজার ৮৪১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিচারকদের মধ্যে ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ দেখতে চান না আইনমন্ত্রী

জুডিশিয়ারিকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে যেতে সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা এ দেশে আর শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ চাই না। আমরা চাই না কোনো বিচারকের নেতিবাচক আচরণের কারণে গোটা জুডিশিয়ারির ওপর মানুষের ক্ষোভ ফিরে আসুক।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ ও প্রশাসনের অনেকের চাকরি চলে গেছে ও অনেকে জেলে গেছেন। যারা সন্ধ্যার পর রাত ১২টা-১টায় মোমবাতি জ্বালিয়ে বিরোধীপক্ষকে দমনপীড়নের জন্য বিচারকার্য সম্পাদন করেছেন, আইন মন্ত্রণালয় তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে—তা দেখতে চায় জনগণ। এটি এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি, কারা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কারণ জনগণ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে, তাদের কাছে আমাদের জবাবদিহিতার বিষয় আছে।’

সূত্র: আমার দেশ 

পলায়নের ঘটনায় হাসিনার নামে নতুন মামলার প্রস্তুতি। (BDC CRIME NEWS24)

 BDC CRIME NEWS24 পলায়নের ঘটনায় হাসিনার নামে নতুন মামলার প্রস্তুতিঃ প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৮: ২৪আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৮: ২৫ পালিয়ে য...