BDC CRIME NEWS24
মুক্তিযোদ্ধা কোটার চাকরিজীবীরা আতঙ্কে:
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬
চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন জীবনে অনিশ্চয়তার অধ্যায় শেষ। কিন্তু এখন সেই নিয়োগই নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরিতে ঢোকা ৯০ হাজার ৫২৭ জনকে নিয়ে চলছে বিস্তর যাচাই-বাছাই, যার প্রথম ধাপ শেষ হলেও এখনো চলমান চূড়ান্ত পর্ব। এ পর্যন্ত প্রায় ৬৮ শতাংশের যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। তবে ২০টি মন্ত্রণালয়ে ২৫৬ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি, ৬০ জনের তথ্যে মিলেছে গরমিল। সামগ্রিকভাবে কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের ১০ শতাংশের বেশি তথ্য অসম্পূর্ণ বা অসংগত বলে জানিয়েছে এ সংক্রান্ত কমিটি। বিভিন্ন দপ্তরে তথ্য চাওয়া হলেও কোথাও ধীরগতি, কোথাও বা লুকোচুরির অভিযোগ উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে নিয়োগ পাওয়াদের অনেকেই চাকরি হারানোর শঙ্কায় দিন পার করছেন। দীর্ঘ দেড় বছরেও যাচাইয়ের পুরো প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে তাদের জীবনে।
কালবেলার হাতে আসা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এবং তিনটি কমিশনে বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়েছেন ৯০ হাজার ৫২৭ জন।
যাচাই-বাছাইয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে চিঠি ইস্যু করলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও কমিশন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে। তবে অনিয়ম করে যারা কোটায় চাকরি নিয়েছেন বা যথাযথ কাগজপত্র জমা দেননি, এমন চাকরিজীবীরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
যাচাই-বাছাই কমিটিতে থাকা কর্মকর্তারা কালবেলাকে জানান, প্রাথমিক ধাপের যাচাই শেষ করে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ চলছে। প্রথম ধাপে যাদের তথ্য অনুপস্থিত বা গরমিল পাওয়া গেছে, তাদের বিষয়ে অধিকতর যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কমিশনে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। বেশিরভাগ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর তথ্য পাঠালেও প্রাপ্ত তথ্যের প্রায় ১০ শতাংশে ঘাটতি বা অসংগতি রয়েছে।
জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আজিজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘কোটায় চাকরি নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করে যাচাই করা হচ্ছে। প্রাথমিক কাজ শেষ করে এখন চূড়ান্ত যাচাই চলছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজারের মতো যাচাই সম্পন্ন হয়েছে, বাকিগুলোর কাজ প্রক্রিয়াধীন।’
জানা গেছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যাচাই-বাছাই শুরু হলে কোটায় সরকারি চাকরি পাওয়া অনেকেই চাকরি হারানোর শঙ্কায় পড়েন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন স্তরে তদবিরও করছেন। কোটায় চাকরি পাওয়াদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হলেও অনেকেই সময়মতো তা জমা দেননি। অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর অবস্থান নিয়ে অধিকতর যাচাই কার্যক্রম চালালেও সময়ক্ষেপণের কারণে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে কাজের গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
প্রাথমিক যাচাই শেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০টি মন্ত্রণালয়ের তথ্য কালবেলার হাতে এসেছে। এসব নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রথম শ্রেণি (ক্যাডার ও নন-ক্যাডার), দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে ৫৭টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও তিনটি কমিশনে চিঠি দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই ও এন্ট্রির পর পরিবীক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে মাত্র একটি মন্ত্রণালয়ের তথ্য সঠিক পাওয়া গেছে। বাকি ১৯টি মন্ত্রণালয়ে ৬০ জনের তথ্যে গরমিল এবং ২৫৬ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় সঠিকভাবে যাচাই সম্পন্ন করা যাচ্ছে না বলে জানান যাচাই-বাছাই কমিটির কর্মকর্তারা।
তথ্যের গরমিল ও তথ্য অনুপস্থিত থাকা চাকরিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর চারটি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাঠায়নি। এ ছাড়া গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে আরও ১৬টি মন্ত্রণালয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনে কোটায় চাকরি পান ৭৯ জন; এর মধ্যে ৫ জনের তথ্যে গরমিল রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে কোটায় চাকরি নেন ৮১১ জন; এর মধ্যে ৪ জনের তথ্যে গরমিল এবং ৩৫ জনের তথ্য অনুপস্থিত। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে কোটায় চাকরি পান ৩০৩ জন; যার মধ্যে ৮ জনের তথ্যে গরমিল ও ১৮ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে কোটায় চাকরি নেন ৮১৩ জন; এর মধ্যে ২ জনের তথ্যে গরমিল এবং ৬৪ জনের তথ্য অনুপস্থিত।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কোটায় চাকরি পেয়েছেন ৩৭ জন; এর মধ্যে ৩ জনের তথ্য নেই। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে ২৭ জনের মধ্যে ১ জনের তথ্যে গরমিল এবং ১ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে ৭ জনের মধ্যে ১ জনের তথ্যে গরমিল রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ে ৭৫ জনের মধ্যে ১ জনের তথ্যে গরমিল ও ১ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে ৭০ জনের মধ্যে ২ জনের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ৯৩ জনের মধ্যে ১ জনের তথ্যে গরমিল এবং ২ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে ১০১ জনের মধ্যে ৫ জনের তথ্যে গরমিল ও ২৩ জনের তথ্য অনুপস্থিত। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে ২৯ জনের মধ্যে ২৬ জনের তথ্য পূর্ণাঙ্গ থাকলেও ২ জনের তথ্যে গরমিল এবং ১ জনের তথ্য নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ৬০ জনের মধ্যে ১ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য অনুপস্থিত।
অর্থ বিভাগে ১৮৯ জনের মধ্যে ৩ জনের তথ্যে গরমিল ও ২ জনের তথ্য নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ২০৭ জনের মধ্যে ৫ জনের তথ্যে গরমিল ও ৩১ জনের তথ্য অনুপস্থিত। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ১৭২ জনের মধ্যে ৪ জনের তথ্যে গরমিল এবং ৪৪ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে ৫৬ জনের মধ্যে ৭ জনের তথ্যে গরমিল ও ১ জনের তথ্য অনুপস্থিত। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৪৫ জনের মধ্যে ১ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ১০৬ জনের মধ্যে ১ জনের তথ্যে গরমিল ও ২১ জনের তথ্য অনুপস্থিত। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ১৯১ জনের মধ্যে ৮ জনের তথ্যে গরমিল ও ৬ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। সংশ্লিষ্টদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে এসব মন্ত্রণালয়ে আবারও চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে কোটায় চাকরি পান ৭ হাজার ৭৭৮ জন। তাদের তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও সময়ক্ষেপণ করে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই; বরং সব তথ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হলে তারাও তথ্য দিতে গড়িমসি করছে বলে যাচাই-বাছাই কমিটির এক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানান।
এদিকে বাতিলের প্রক্রিয়ায় থাকা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার কিছু নাম ব্যবহার করে যারা চাকরি নিয়েছেন, তাদের চাকরিও বাতিল হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ছাড়া যেসব মুক্তিযোদ্ধার বয়স কম দেখানো হয়েছে এবং যাদের গেজেট বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে, তাদের গেজেট চূড়ান্তভাবে বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট কোটার চাকরিজীবীরাও জটিলতায় পড়তে পারেন।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব নেন। ওই দিনই তিনি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সভায় স্বাধীনতার পর থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটার আওতায় গ্রেড অনুযায়ী কতজন সরকারি চাকরি পেয়েছেন, সেই তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এবং প্রত্যেকের সরকারি চাকরির নিয়োগবিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের পিতা/মাতা/পিতামহ/মাতামহের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও গেজেট নম্বর সঠিক কিনা এবং যথাযথ সব কাগজপত্র জমা দিয়েছে কি না তা যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দেন। এরপর মন্ত্রণালয় কমিটি করে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত—এই দুই ধাপে অতি গোপনীয়তার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করছে। কিন্তু দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও চূড়ান্তভাবে যাচাই-বাছাই শেষ করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। গত ১৯ মাসে মাত্র ৬৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলমান রয়েছে। প্রাথমিক যাচাই শেষ করে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ এগিয়ে চলছে।’
সূত্র: কালবেলা

No comments:
Post a Comment