BDC CRIME NEWS24
প্রতিশ্রুতি ছিল মেধাভিত্তিক-অভিযোগ দলীয়করণেরঃ
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮: ৩৪
ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের বড়
একটি অংশজুড়ে ছিল মেধাভিত্তিক প্রশাসন গঠনের অঙ্গীকার। প্রশাসনকে রাজনীতিকীকরণের বাইরে
রাখতে প্রচলিত ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের আমলাতন্ত্রের খোলনলচে বদলাতে ইশতেহারে দলটি ‘মেরিটোক্রেসি’
প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। এর মাধ্যমে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে
নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির মাপকাঠি ঘোষণা করা হয়। ব্যক্তিগত মতাদর্শের কারণে কাউকে
বঞ্চিত না করার প্রতিশ্রুতিও দেয় দলটি। একই অঙ্গীকার রয়েছে বিএনপির ৩১ দফার রাষ্ট্রকাঠামো
সংস্কারের রূপরেখাতেও।
তবে গত ছয় মাসে নির্বাচনি এ প্রতিশ্রুতি পূরণ
হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও
দপ্তরে নিয়োগের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
হতাশা ব্যক্ত করে তারা বলেন, প্রশাসনে বহু প্রত্যাশার সংস্কার কার্যক্রম সেই তিমিরেই
রয়ে গেছে। সবকিছু চলছে আগের মতোই।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল মঙ্গলবারও
মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এক অনুষ্ঠানে
তিনি বলেন, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের আরো বেশি কাজের সুযোগ করে দিতে চাই।
প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের অবস্থানের পরও রাজনৈতিক
নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি সরকারি দপ্তরগুলোতে ঘুস, দুর্নীতি, ফাইল জিম্মি করে টাকা
আদায় আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শতাধিক সেবাগ্রহীতার
সঙ্গে কথা বলে আমার দেশ। তাদের অধিকাংশই বলেছেন, সেবা পেতে ঘুস দিতে হয়েছে। সুশাসন
ও নাগরিক সেবা নিয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি সংস্থার প্রধানদের মতেÑ সরকারি দপ্তরগুলোতে
জনগণের হয়রানি ও অর্থের বিনিময়ে সেবা দেওয়ার প্রবণতা আগের মতোই চলছে।
শিক্ষা খাতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সরকারের
প্রথম ছয় মাসে ২৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ হয়। তাদের
অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দল এবং এর বিভিন্ন পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে
সম্পৃক্ত। সেখানে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে
শিক্ষকদের অভিযোগ।
রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন
পদে দলীয় নেতাদের নিয়োগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে।
তাদের দাবি, রীতি অনুযায়ী এসব পদে সাধারণত অতিরিক্ত সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন
করা হয়। আগেও বিভিন্ন সময়ে এসবের কোনো কোনোটিতে রাজনৈতিক নিয়োগ হয়েছে। তবে এবারই ঢালাওভাবে
একযোগে ১১টি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় নিয়োগ হয়েছে। এর আগে সিটি করপোরেশন
ও জেলা পরিষদে সরকার দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন
তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের
নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেছেন বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। নিয়োগপ্রাপ্তদের
কারো কারো দলের প্রতি কমিটমেন্ট নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও অন্তর্বর্তী সরকারের
সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার মনে করেন, যার কাজ তাকে দিয়ে করানোই উচিত। আমার দেশকে
তিনি বলেন, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেমন রাজনীতিতে জড়ানো উচিত নয়, ঠিক তেমন
প্রশাসনের পদগুলোতেও ঢালাওভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া ঠিক নয়। এটি প্রশাসনকে
আরো বেশি করে বিতর্কিত করে তুলবে। এমনিতেই আমাদের জনপ্রশাসন রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির
মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যে দল ক্ষমতায় আসে, প্রশাসন তার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবল আশঙ্কা
কাজ করে। এ অবস্থায় প্রশাসনকে রাজনীতির বাইরে রেখে সত্যিকারের জনবান্ধব করে গড়ে তোলা
আবশ্যক।
ঢালাওভাবে একসঙ্গে এতগুলো সরকারি সংস্থার নেতৃত্বস্থানীয়
পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ উদ্বেগজনক, তবে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু নয়, বিচ্ছিন্ন
কোনো বিষয়ও নয়Ñএমন মন্তব্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী
পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের। আমার দেশকে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার
পর শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো নজরদারি সংস্থার শীর্ষ পদ থেকে শুরু
করে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ রাষ্ট্রীয়
গুরুত্বপূর্ণ যত নিয়োগ দেওয়া বা অপসারণ করা হয়েছে, সব ক্ষেত্রেই সরকার কর্তৃত্বপরায়ণ
আমলের মতো রাষ্ট্র-কাঠামোতে দলীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যের সংস্কৃতি অনুসরণ করছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের ৩১ দফা ও নির্বাচনি
ইশতেহারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের সুনির্দিষ্ট
ঘোষণা ছিল। অথচ বাস্তবে তার প্রয়োগে বড় ধরনের সদিচ্ছার ঘাটতি ও বিপরীতমুখী চর্চা
দেখা যাচ্ছে। কর্তৃত্ববাদের পতন হয়েছে, কর্তৃত্ববাদী দলীয়করণের পরিবর্তন হয়নি। শুধু
‘উইনার টেইকস অল’ চর্চার পালাবদল হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
সেবাগ্রহীতাদের মতে, সরকার বদলালেও ঘুস, দুর্নীতি,
অনিয়মের ক্ষেত্রে কোনো হেরফের হয়নি। ফাইল আটকে টাকা আদায় চলছে সেই আগের মতোই। ঘুস
ছাড়া কোনো ফাইল নড়াচড়া তো দূরের কথা, কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলাও মুশকিল। তাদের
মতে, রাজউক, সিটি করপোরেশন কার্যালয়, ভূমি অফিস, বিআরটিএ পাসপোর্ট অফিসগুলোসহ প্রান্তিক
জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারি দপ্তরগুলোতে ঘুসের পরিমাণ আগের চেয়ে বেড়েছে। এমন
চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনেও।
ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের আটটি জেলায় বিভাগীয় শহরের সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। একজন সেবাগ্রহীতা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, ভূমি অফিস থেকে ঘুস ছাড়া কেউ কোনো নথি নিষ্পত্তি করতে পেরেছেন, এমন নজির নেই। রিয়েল স্টেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। ঘুস ছাড়া রাজউক থেকে রিহ্যাবের (রিয়েল স্টেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন) সদস্যরা কোনো নকশা অনুমোদন করতে পেরেছেন, এমন একটি উদাহরণও নেই বলে দাবি করেন তারা।
মেধার মূল্যায়ন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি
রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার নবম
দফায় রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক, আইনগত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের প্রভাবমুক্ত
করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এক্ষেত্রে
প্রয়োজনীয় আইন সংস্কারের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন করা হবে বলে অঙ্গীকার
রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের আগে সংসদীয় কমিটির শুনানি ও ভেটিং
প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা
নিশ্চিত হয়।
১১ নম্বর দফায় প্রশাসনিক সংস্কার প্রসঙ্গে
বলা হয়েছেÑ দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করার
প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি প্রশাসন ও পুলিশের সংস্কার
হবে। বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে একমাত্র যোগ্যতাকে মাপকাঠি
হিসেবে বিবেচনা করার অঙ্গীকার করা হয়েছে, যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত যোগ্য জনবল নিশ্চিত
হয়।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের মুখবন্ধে বলা
হয়েছে, সুদীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হাজারো শহীদের রক্ত, জুলাইযোদ্ধাদের অসীম আত্মত্যাগ
ও শহীদ মায়েদের প্রত্যাশা আমাদের সামনে একটি অনিবার্য দায়িত্ব তুলে দিয়েছে। আর সেটি
হলোÑএকটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যার লক্ষ্য মানবিক,
জনগণকেন্দ্রিক ও ইনসাফভিত্তিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ইশতেহারে গুরুত্বসহকারে এ-ও বলা হয়েছে,
মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে রাজনীতিকীকরণ
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নগ্ন দলীয়করণের
রেকর্ড হয়েছিল পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফ্যাসিবাদের
দোসর ও গণহত্যায় সহযোগী উপাচার্যদের (ভিসি) সরিয়ে বা তাদের পদত্যাগের কারণে শূন্যপদে
তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও এসব উপাচার্যের দুয়েকজন
জামায়াতপন্থি বা প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয়হীন থাকলেও বাকি সবাই ছিলেন বিএনপির অনুসারী
বা সক্রিয় সদস্য।
চার বছরের জন্য এসব উপাচার্য নিয়োগপ্রাপ্ত
হলেও দুই বছর মেয়াদ পূরণেরও সুযোগ পাননি তারা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার এক মাসের
মাথায় শুরু হয় উপাচার্য পরিবর্তন। ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এ পর্যন্ত
অন্তত ২৮টিতে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কয়েকজনের সরাসরি
দলীয় রাজনীতিতে জড়িত, বাকিরা বিএনপির পেশাজীবী সংগঠনÑ জিয়া পরিষদ, জাতীয়তাবাদী পেশাজীবী
পরিষদ বা শিক্ষক সংগঠন সাদা দল ও ইউট্যাবের সাবেক ও বর্তমান নেতা। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে
পর্যায়ক্রমে উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) ও ট্রেজারার পদেও পছন্দসই লোক নিয়োগ দেওয়া
হচ্ছে।
এক্ষেত্রে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা-যোগ্যতার
চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকেই সরকার প্রাধান্য দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ । এমনকি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবিসহ ভিন্ন
বিভাগের শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিজ প্রতিষ্ঠানে যোগ্য লোক থাকলেও
অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগ পাচ্ছেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এসব কারণে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ
ও সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া কিছু বিতর্কিত শিক্ষকও নিয়োগ পাচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনায়
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের এক ঘণ্টার মাথায় তা বাতিল করা হয়।
একই ধরনের অভিযোগে ২৩ দিনের মাথায় জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপাচার্য পরিবর্তন করা হয়েছে।
একযোগে আট ভিসি পরিবর্তন
বিএনপি সরকার গঠনের এক মাসের মাথায় গত ১৬
মার্চ প্রথমবারের মতো একযোগে ঢাবিসহ আট পাবলিক বিশ্ববিদালয়ের ভিসি পরিবর্তন করা হয়।
একই দিনে পরিবর্তন করা হয় ইউজিসি চেয়ারম্যানও। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী
সরকারের সময়ে পরিবর্তন করা ইউজিসি চেয়ারম্যান ও উপাচার্যদের মেয়াদ মাত্র দেড় বছর
না যেতেই তা অনেকটা গণহারে পরিবর্তন হওয়ায় বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহল ব্যাপক সমালোচনা
করেছে। দলীয় লোকদের বসাতেই কোনো কারণ ছাড়া আগের ভিসিদের সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অনেকে
মন্তব্য করেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নিয়োগের সংস্কৃতির
বিষয়ে বিশ্লেষক সাবিনা আহমেদ আমার দেশকে বলেন, বাংলাদেশে ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে
কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ
প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানগুলোতে দলীয় লোক নিয়োগের যে ধারা চলে আসছে, তা কোনো আকস্মিক
ঘটনা নয়। এটি এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতিÑ যাকে ‘বিজয়ীর সবকিছু দখল’
নীতির ক্লাসিক প্রকাশ বলা চলে। এটি নিছক ক্ষমতার অভ্যাস, যা ক্রমে প্রতিষ্ঠানকে দলীয়
সম্পত্তিতে পরিণত করছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি গঠনেও দলীয়করণ
দেশের স্কুল-কলেজ ও মাদরাসাগুলো পরিচালনায়
ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিংবডি গঠনে ভোটের মাধ্যমে শিক্ষক-অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচনের
নিয়ম আছে। তবে নানা অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে সেই নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানগুলো।
দলীয়করণের মাধ্যমে একের পর এক গঠন করা হচ্ছে অ্যাডহক কমিটি। এমনকি জরুরি অবস্থার নিয়ম
কাজে লাগিয়ে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময়ে বিশেষ পরিস্থিতি কমিটিও গঠন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজে গভর্নিংবডি নির্বাচনের আয়োজন করা হলেও
তা শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি
হয়েছে। অনির্বাচিত কমিটি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনিয়ম-দুর্নীতি ও দলীয়করণসহ
নানা জটিলতা বাড়ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে দেশের সব দাখিল ও আলিম মাদরাসার মেয়াদোত্তীর্ণ
অ্যাডহক কমিটি বাতিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে অ্যাডহক কমিটি
গঠনের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার
প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত সব প্রতিষ্ঠান প্রধানদের জানানো হয়েছে। নিয়মিত কমিটির পরিবর্তে
এভাবে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক গতি বিঘ্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন
সংশ্লিষ্টরা।
প্যাকেটবন্দি প্রশাসনিক সংস্কারের সুপারিশ
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের
নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত আমলা
আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন আমলাতন্ত্রের ঔপনিবেশিক
ও সামন্তবাদী মানসিকতা ও কাঠামো ভেঙে দেশপ্রেমিক, জনবান্ধব, দুর্নীতিমুক্ত ও আইনের
প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি দক্ষ প্রশাসন গঠনের লক্ষ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করে।
এতে জনপ্রশাসনে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন, শৃঙ্খলা বিধান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের নানামুখী
পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ সুপারিশ তৈরির আগে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ, দেশের বিভিন্ন
শ্রেণি ও পেশার নাগরিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিমত নেয় মুয়ীদ কমিশন। রাজনৈতিক
প্রভাব ও লেজুড়বৃত্তির বাইরে থেকে সবক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা
ও দক্ষতা যাচাইয়ের কথা বলা হয় কমিশনের প্রতিবেদনে। এ জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা
তুলে দেওয়া, জুডিশিয়াল সার্ভিসের মতো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কমিশন গঠন করারও সুপারিশ
করে এ কমিশন। কমিশনের ওই সুপারিশ এখনো প্যাকেটবন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তারা।
মুয়ীদ কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে গবেষক ও জনপ্রশাসন
সংক্রান্ত অসংখ্য বইয়ের লেখক ফিরোজ মিয়া আমার দেশকে বলেন, দেশে বর্তমানে যে প্রশাসন
রয়েছে সেটা জনবান্ধব নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জনপ্রশাসনকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির
সর্বনিম্ন স্তরে নামানো হয়েছে। দুর্নীতি, দুঃশাসন ও মানুষকে দমিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে
এটি করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনকে আওয়ামী ধারা থেকে বের করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এখনো ওই প্রশাসনিক কাঠামোই রয়ে গেছে। প্রশাসনকে দলীয় গণ্ডির ভেতর থেকে বের করে সত্যিকারের
জনবান্ধব প্রশাসন হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে দেশে কখনোই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব
হবে না ।
সূত্রঃ আমার দেশ

No comments:
Post a Comment