BDC CRIME NEWS24
বিদেশে বসেই ‘রিমোট কন্ট্রোল’ চাঁদাবাজি:
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ১০: ৩৮
দিনে ব্যবসা, রাতে গুলির আতঙ্ক—চট্টগ্রামের বন্দরনগরীতে এখন এটাই বাস্তবতা। বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি টাকার চাঁদা দাবি করছে। দিতে অস্বীকার করলেই চলছে হামলা—পুলিশ পাহারাও ঠেকাতে পারছে না এই সংগঠিত সন্ত্রাসকে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পর চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় মুখোশধারী চার সন্ত্রাসী। তাদের হাতে থাকা পিস্তল, সাবমেশিনগান, চাইনিজ রাইফেল ও শটগান দিয়ে মুহূর্তেই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। বাড়িতে তখন পুলিশের পাঁচ সদস্য পাহারায় থাকলেও হামলাকারীদের ঠেকানো সম্ভব হয়নি। একই বাড়িতে এটি ছিল চাঁদার দাবিতে দ্বিতীয় দফা হামলা।
এর আগে ২ জানুয়ারি বাড়িটিতে প্রথম হামলা চালানো হয়। কারণ একটাই—কোটি টাকার চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি। ভুক্তভোগীর দাবি, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ প্রথমে ১০ কোটি টাকা দাবি করে, পরে তা কমিয়ে ৫ কোটিতে আনে। অস্বীকৃতি জানালে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা আসে—‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’। এরপরই শুরু হয় হামলা, তাণ্ডব।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিদেশে বসে মুঠোফোনে হুমকি, হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা, সোর্স দিয়ে নির্মাণাধীন ভবনের ভিডিও সংগ্রহÑএভাবে এক অদৃশ্য অথচ নিষ্ঠুর সন্ত্রাসের জাল বিস্তার করেছে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের সবচেয়ে আলোচিত নামটি হলো সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’। সে দীর্ঘদিন ধরে ভারতে পলাতক থেকেও চট্টগ্রামের অন্তত পাঁচটি থানার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। নির্মাণাধীন ভবনের ভিডিও সংগ্রহ করে সম্ভাব্য টার্গেট চিহ্নিত করে ফোনে নিজে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে চাঁদার দাবি জানায় সে। চলতি বছরের মার্চে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার সাইদুল ইসলামের মোবাইল ফোনে এমন একাধিক ভিডিও ও কথোপকথনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানায়, নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, হাটহাজারী ও চকবাজার এলাকায় তার অন্তত অর্ধশত ‘সোর্স’ সক্রিয় রয়েছে। এসব এলাকার নির্মাণাধীন ভবন, ইটভাটা ও পরিবহন খাতÑ সবই এই চাঁদার জালে আটকা।
গত দেড় বছরে একাধিক গুলির ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট হাটহাজারীতে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে গুলি চালানো হয় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায়। এ ঘটনায় বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম আসে তদন্তে।
পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবিতে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানার কালারপুরে নির্মাণাধীন ভবনে সন্ত্রাসী ‘ছোট সাজ্জাদ’ শটগান নিয়ে প্রকাশ্যে প্রবেশ করে গুলিবর্ষণ করে। সিসিটিভিতে পুরো ঘটনা ধরা পড়লেও ভবন মালিকেরা মামলা করতে সাহস পাননি। ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাঁচলাইশে নির্মাণাধীন ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বড় সাজ্জাদের সহযোগীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়।
রাউজান থেকে বন্দর : সন্ত্রাসের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
চাঁদাবাজির বিস্তার এখন চট্টগ্রামের প্রায় সব খাতেই। রাউজানে ৫ আগস্টের পর থেকে ৪৮টি ইটভাটা থেকে প্রায় এক কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। রাঙামাটি থেকে আসা কাঠবোঝাই ট্রাকপ্রতি ৩০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি চট্টগ্রাম বন্দরে, যেখানে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছিলেন সাবেক নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন।
অপরাধ জগতের এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চারজনের নাম। হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ব্যবসাÑসব মিলিয়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এদের মধ্যে শীর্ষে আছে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাবশালী নাম সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। ভারতে পলাতক ‘এইট মার্ডার’ মামলার মৃত্যুদণ্ড আসামি মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে সরাসরি চাঁদার দাবি জানায়। বড় সাজ্জাদ নিজে ফোন করে, না হলে পরিচিত নম্বর থেকে বার্তা পাঠায়। কাস্টমস কর্মকর্তারাও এই পদ্ধতিতে প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন জানিয়ে বন্দর থানায় জিডি করেছিলেন।
এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৫টির বেশি মামলার পলাতক আসামি। ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নগরের বিভিন্ন এলাকায় তার বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার, ভয়ভীতি ও টার্গেটেড হামলার অভিযোগ রয়েছে।
বড় সাজ্জাদ বাহিনীর কথিত কিলিং স্কোয়াডের প্রধান মোহাম্মদ রায়হান এ তালিকার তৃতীয় ব্যক্তি। গত এক বছরে অন্তত ৯টি হত্যাকাণ্ডে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়ানো পলাতক রায়হানকে ধরতে বিশেষ অভিযান চলছে।
চট্টগ্রামের বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও ও হাটহাজারী এলাকাকে ঘিরে আরেক আতঙ্কের নাম হাবিব খান। বিদেশে অবস্থান করলেও সে অনুসারীদের মাধ্যমে এসব এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের। বেশ কয়েকটি তদন্ত দল ইতোমধ্যে তার আর্থিক নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখছে।
এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, চট্টগ্রামকে ‘সেফ সিটি’ করার লক্ষ্যে মাদক ও চাঁদাবাজি নির্মূলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজির তথ্য জানাতে ‘হ্যালো সিএমপি’ অ্যাপও চালু করা হয়েছে।
তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। স্মার্ট গ্রুপের মালিকের বাড়িতে পুলিশ পাহারার মধ্যে দ্বিতীয় দফা গুলির ঘটনা প্রমাণ করে, পুলিশ উপস্থিতিও সন্ত্রাসীদের থামাতে পারছে না। বড় সাজ্জাদকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) (অতিরিক্ত দায়িত্বে) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, আমরা কিন্তু থেমে নেই। পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে। বড় সাজ্জাদের বিষয়ে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁদা না দিলে গুলি খেতে হবে আর দিলে মেনে নিতে হবে এই জুলুমÑএ দুয়ের মাঝখানে আটকা পড়েছেন তারা। অনেকে পুলিশের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ মামলা করলে পাল্টা হামলার আশঙ্কা থাকে। বন্দরনগরীতে এই নীরব সন্ত্রাস চলতে থাকলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না, উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হবেন এই আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড়।
সূত্র: আমার দেশ

No comments:
Post a Comment